প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স ও ডেগে ভক্তদের দেওয়া অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। দানের অর্থের একটি অংশ মাজারের উন্নয়নকাজে এবং বাকি অংশ দৈনন্দিন ব্যয় ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত আগে নেওয়া হয়েছিল, তা আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। আপাতত দানবাক্স ও ডেগ থেকে পাওয়া পুরো অর্থই ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
শনিবার পঞ্চমবারের মতো প্রকাশ্যে শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স ও ঐতিহাসিক ডেগে জমা হওয়া অর্থ গণনা শুরু হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জেলা প্রশাসকসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা, মাজার ব্যবস্থাপনায় গঠিত কমিটির প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এই গণনা কার্যক্রম শুরু হয়। মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রকাশ্যে অর্থ গণনার এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে।
গণনা শুরুর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এবারের গণনায় পাওয়া অর্থও আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপাতত ব্যাংক হিসাবে রাখা হবে। সেখান থেকে মাজারের বিদ্যুৎ বিলসহ প্রয়োজনীয় কিছু ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হবে। একই সঙ্গে আনসার সদস্যদের বেতনও দেওয়া হবে।
তিনি জানান, মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল করতে তিনজন লোক নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন ম্যানেজার, একজন হিসাবরক্ষক এবং একজন কম্পিউটার অপারেটর থাকবেন। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো কার্যকর করা হবে। জেলা প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগ সম্পন্ন হতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। এর আগে প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় আরও একবার দানবাক্সের অর্থ গণনা হতে পারে।
মাজারের দানের অর্থ ৩৫ শতাংশ ও ৬৫ শতাংশ হারে ভাগ করার আগের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জেলা প্রশাসক বলেন, উচ্চপর্যায়ের কমিটি সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মাজার পরিচালনায় নিয়মিতভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, পরিচ্ছন্নতা, কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যয় রয়েছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করেই অর্থ ব্যবহারের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সভায় দানের অর্থ ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দানবাক্স থেকে পাওয়া অর্থ প্রতিদিন গণনা করার কথা ছিল। মোট অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজের জন্য সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে জমা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাকি ৬৫ শতাংশ মাজারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার কাজে ব্যয় করার কথা ছিল।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সভা শেষে ওই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন কমিটির সদস্যসচিব ও সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। তখন জানানো হয়েছিল, উন্নয়নকাজের জন্য নির্ধারিত ৩৫ শতাংশ অর্থ যে ব্যাংক হিসাবে জমা থাকবে, সেটি জেলা প্রশাসক ও মাজারের মোতোয়াল্লির যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে। এর মাধ্যমে অর্থের ব্যবহার ও সংরক্ষণে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় জনসাধারণের আস্থা বাড়াতে একজন ব্যবস্থাপক নিয়োগের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা অথবা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা হতে পারেন বলে তখন জানানো হয়। পাশাপাশি একজন হিসাবরক্ষক ও একজন অফিস সহকারী নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়। নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অধীনে প্রতিদিন দানের টাকা গণনা এবং হিসাব সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল।
মাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও রয়েছে। নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাসহ মাজারের বিভিন্ন বিষয়ে এই কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। জেলা প্রশাসককে কমিটির আহ্বায়ক রাখার কথা রয়েছে। কমিটিতে সিলেট সিটি করপোরেশন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিলেট মহানগর পুলিশ, সিলেট জেলা পরিষদ ও পুলিশ সুপারের একজন করে প্রতিনিধি থাকার কথা। মাজারের মোতোয়াল্লি সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন।
শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৩ জুন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদ্দিরের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
এর আগে ১৮ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগে মাজারের পুরোনো দানবাক্সগুলো সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সময়ে মাজারে দান করা নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার ঐতিহাসিক তিনটি ডেগও সিলগালা করা হয়। প্রশাসনের এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সিলেটে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
এরপর ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। পরদিন তাঁর উপস্থিতিতে দানবাক্সের তালা খুলে জনসমক্ষে অর্থ গণনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মাজারের দানের অর্থ প্রকাশ্যে গণনার একটি নতুন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
প্রশাসনের উদ্যোগের পর এখন পর্যন্ত চার দফা প্রকাশ্যে মাজারের দানের অর্থ গণনা করা হয়েছে। প্রথম দফায় ২২ জুন দানবাক্স ও ডেগ থেকে পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পরে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকার একটি চেক যুক্ত হওয়ায় মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা।
এরপর ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফার গণনায় পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। ১৫ আগস্ট তৃতীয় দফার গণনায় পাওয়া যায় ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা। সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর চতুর্থ দফার গণনায় দানবাক্স ও ডেগ থেকে পাওয়া যায় ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা। ওই দফার গণনায় নগদ অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ ও রুপাও পাওয়া যায়।
চার দফার গণনা শেষে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাজারের দানবাক্স ও ডেগ থেকে মোট ২ কোটি ২৯ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪০ টাকা পাওয়া যায়। এর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও মূল্যবান ধাতু পাওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে। ফলে মাজারের দানের অর্থের পরিমাণ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সুসংগঠিত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে আলোচনায় আসে।
শনিবার পঞ্চম দফায় প্রকাশ্যে অর্থ গণনার মধ্য দিয়ে সেই ধারাবাহিকতা আরও এগিয়ে গেল। তবে এবারও দানের অর্থ সরাসরি ভাগ করে ব্যয় করার পরিবর্তে আপাতত ব্যাংকে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন জনবল নিয়োগ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর দানের অর্থের দৈনন্দিন ব্যয় ও উন্নয়নকাজে ব্যবহারের বিষয়ে নির্ধারিত নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে।
শাহজালাল (রহ.) মাজার সিলেটের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে আসেন। ভক্তদের দান করা অর্থ তাই শুধু একটি আর্থিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে মাজারের ব্যবস্থাপনা, জনআস্থা, ধর্মীয় অনুভূতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্নও জড়িত। ফলে দানের অর্থ কীভাবে গণনা, সংরক্ষণ ও ব্যয় করা হচ্ছে—এ বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখাকে সংশ্লিষ্টরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
বর্তমানে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে অর্থ ব্যবস্থাপনায় নিয়ম, হিসাব এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। নতুন কর্মী নিয়োগের পর প্রতিদিন দানের অর্থ গণনার যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব আরও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা। আপাতত পুরো অর্থ ব্যাংকে রেখে প্রয়োজনীয় ব্যয় পরিচালনার সিদ্ধান্ত সেই প্রক্রিয়াকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।


