প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের অবকাশে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। সাদা পাথরের স্বচ্ছ জলরাশি, রাতারগুলের জলাবন, চা-বাগানের সবুজ বিস্তৃতি আর পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। পর্যটকদের এই ব্যাপক উপস্থিতিতে প্রাণ ফিরেছে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়। তবে আনন্দের এই ভিড়ের সঙ্গে দেখা দিয়েছে আবাসন সংকটও। অনেক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে আসা পর্যটকদের কেউ স্বজনের বাসায়, কেউ পরিচিতজনের সহায়তায় থাকার ব্যবস্থা করছেন। আবার কেউ কেউ হোটেলে জায়গা না পেয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে রাত কাটানোর আশ্রয় খুঁজছেন।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে কয়েক দিন ধরেই পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। নগরীর হোটেলগুলোতে কক্ষের চাহিদা বেড়েছে, আর পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নৌকার মাঝি, পরিবহনকর্মী, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, এবারের ছুটিতে পর্যটন খাতে ভালো ব্যবসা হবে।
সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে অবস্থিত গোল্ডেন সিটি হোটেলের মহাব্যবস্থাপক মৃদুল কান্তি দত্ত জানান, কয়েক বছরের মধ্যে এবার তাঁদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ঈদের ছুটির তুলনায়ও এবার পর্যটকদের সাড়া বেশি বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ছুটি শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগেই অধিকাংশ হোটেলের কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পর সিলেটের পর্যটন খাতে এমন প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর তিন তারকা হোটেল সিলেট রিজেন্সিতে। প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর অব আইটি মো. জাহিদ হোসেন জানান, এবার পর্যটকদের সাড়া তাঁদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ছুটি শুরুর অন্তত ১২ দিন আগেই হোটেলের সব কক্ষ বুকিং হয়ে যায়। পরবর্তী চার দিনও হোটেলটি পুরোপুরি বুকড থাকার কথা জানান তিনি।
পর্যটকদের এই আগ্রহের পেছনে দীর্ঘ ছুটির পাশাপাশি সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের আকর্ষণও বড় ভূমিকা রাখছে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা অনেকেই এক ভ্রমণেই একাধিক পর্যটনকেন্দ্র দেখার পরিকল্পনা করছেন। কেউ সকালে সাদাপাথর ঘুরে বিকেলে চা-বাগানে যাচ্ছেন, আবার কেউ জলাবন ও নদীকেন্দ্রিক পর্যটনকেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখছেন।
পূজার ছুটিতে নেত্রকোনা থেকে পরিবার নিয়ে সিলেটে বেড়াতে এসেছেন পীযূষ ঘোষ। তিনি নগরীর লাক্কাতুরা এলাকার মালনীছড়া চা-বাগান ঘুরে দেখেন। পীযূষ জানান, দীর্ঘ ছুটি পাওয়ায় পরিবার নিয়ে সিলেট ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছেন। সকালে সাদাপাথর ঘুরে ফেরার পথে চা-বাগান দেখতে যান তাঁরা। তাঁর মতে, দূর থেকে চা-বাগানের সৌন্দর্য আকর্ষণীয় হলেও ভেতরে গিয়ে সবুজের বিস্তার আরও ভালোভাবে উপভোগ করা যায়।
রাজশাহী থেকে আসা এম এ তাহেরও রাতারগুল জলাবন ঘুরে মুগ্ধ হয়েছেন। এত দিন মানুষের মুখে গল্প শুনে এবং ইন্টারনেটে ছবি দেখে রাতারগুল সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়েছিল তাঁর। সরাসরি সেখানে গিয়ে সেই ধারণার চেয়েও বেশি সৌন্দর্য দেখতে পেয়েছেন বলে জানান তিনি। এমন অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে সিলেটের প্রাকৃতিক আকর্ষণকে আরও স্মরণীয় করে তুলছে।
পর্যটকদের ভিড়ে সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষও। সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রের নৌকার মাঝি তোফাজ্জল ইসলাম জানান, ঘাটে প্রায় দেড় শ ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে তাঁদের আয়ও বাড়ে। তাঁর ভাষ্য, পূজার ছুটি উপলক্ষে গত ১৬ অক্টোবর থেকে পর্যটকদের আগমন বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে একটি নৌকা দিনে পাঁচ থেকে সাতটি ট্রিপ দিতে পারছে, কোনো কোনো নৌকা আট থেকে নয়টি ট্রিপও দিচ্ছে।
নৌকার মাঝিদের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবহনচালক, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পর্যটনকেন্দ্রের আশপাশের বিভিন্ন সেবাদানকারীও পর্যটকের উপস্থিতি থেকে উপকৃত হচ্ছেন। পর্যটন মৌসুমে এসব মানুষের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এই সুযোগ ধরে রাখতে পর্যটকদের নিরাপত্তা, যাতায়াতের সুবিধা, পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান বজায় রাখা জরুরি।
ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রামিম আহমদ জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সব কক্ষ ১৬ অক্টোবর থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বুকিং রয়েছে। এ তথ্য থেকে ছুটির সময় পর্যটনকেন্দ্রসংলগ্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানে কক্ষের চাহিদার চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেট জেলার প্রায় পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। ফলে শেষ মুহূর্তে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া পর্যটকদের জন্য থাকার জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং পর্যটনকেন্দ্রের কাছাকাছি হোটেলগুলোতে নতুন করে কক্ষ পাওয়া যাচ্ছে না বলে ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে।
চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে বেড়াতে আসা সবুজ তালুকদার জানান, আম্বরখানা ও জিন্দাবাজার এলাকার কয়েকটি হোটেলে ঘুরেও তিনি কক্ষ পাননি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মাজার প্রাঙ্গণে অবস্থান করছেন। পরে কোনো হোটেলে ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, পর্যটকদের আগমন বাড়লেও সবার জন্য আগাম বুকিং ছাড়া থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তবে পর্যটন খাতের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে আবাসন সংকটের চিত্র নিয়ে কিছুটা ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পর্যটন সাবকমিটির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, অন্য অনেক সময়ের তুলনায় এবার পূজায় পর্যটকদের সমাগম বেশি হলেও ঈদের সময়ের তুলনায় তা অনেক বেশি—এমনটি বলা যাবে না। তাঁর মতে, সিলেটে উচ্চমানের হোটেল থেকে শুরু করে তুলনামূলক কম খরচের আবাসন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর হোটেলে কক্ষ না পাওয়া গেলেও সব প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি একই নয়। তবে ঈদের পর পূজার ছুটিতে পর্যটকদের এমন উপস্থিতিকে তিনি পর্যটন খাতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
সিলেটের অন্যতম পর্যটনসমৃদ্ধ উপজেলা গোয়াইনঘাটেও পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। এ উপজেলার সাদাপাথরসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ছুটি শুরুর পর থেকেই মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকেই পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের ভিড় শুরু হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
পর্যটকদের এই ঢল স্থানীয় অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনা তৈরি করলেও আবাসন ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ যাতায়াত এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোর পরিবেশ রক্ষায় বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন। ভ্রমণের আগে হোটেল বুকিং নিশ্চিত করা, নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে জেনে নেওয়া এবং অপরিচিত স্থানে নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা করা পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত পর্যটন মৌসুমে তথ্যসেবা ও নিরাপত্তা তদারকি জোরদার করা, যাতে ভ্রমণকারীরা হয়রানি ছাড়াই প্রয়োজনীয় সেবা পান।
দুর্গাপূজার ছুটিতে সিলেটে পর্যটকদের আগমন স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি এনেছে। হোটেল-রিসোর্টের বুকিং, নৌকার ট্রিপ এবং পর্যটনকেন্দ্রের আশপাশের ব্যবসায়িক তৎপরতা সেই ব্যস্ততারই প্রতিফলন। তবে একই সঙ্গে আবাসনসংকটের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে, পর্যটকদের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে পরিকল্পিত ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজন। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের এই আগ্রহ যেন নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়, সে জন্য ব্যবসায়ী, প্রশাসন ও পর্যটকদের সমন্বিত দায়িত্বশীলতা জরুরি।


