মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

প্রকাশ:২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

মাদ্রাসায় শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন, বলাৎকার ও অশালীন আচরণের মতো গর্হিত ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র স্থানে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা জানান ধর্মমন্ত্রী। তিনি বলেন, মাদ্রাসায় এ ধরনের গর্হিত ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে ইমামদের সচেতনতামূলক বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নৈতিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা পরিবারের বিষয় হয়ে থাকে না; বরং সমাজের সামগ্রিক দায়িত্ববোধের প্রশ্ন সামনে আসে। যেসব পরিবার সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতা অর্জনের আশায় মাদ্রাসায় পাঠায়, তাদের প্রত্যাশা থাকে সেখানে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করবে। শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে স্নেহ, যত্ন, শৃঙ্খলা এবং নৈতিক শিক্ষার প্রত্যাশা করেন অভিভাবকেরা। সেই পরিবেশে কোনো ধরনের যৌন নির্যাতন বা অশালীন আচরণের অভিযোগ উঠলে তা শিশু, পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ কারণেই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু বক্তব্য বা সতর্কবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কোনো অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরপেক্ষভাবে ঘটনার তদন্ত করার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার অজুহাতে অভিযোগ উপেক্ষা করা বা ভুক্তভোগী শিশুকে চুপ থাকতে বাধ্য করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

জাতীয় ইমাম সমিতির কাউন্সিল অধিবেশনে ধর্মমন্ত্রী সারা দেশ থেকে আসা ইমামদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মন্ত্রী বলেন, কেউ যেন উসকানি দিয়ে দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সমাজে শান্তি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় মসজিদের ইমাম ও ধর্মীয় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ধর্মীয় আলোচনা, জুমার খুতবা এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁরা মানুষের কাছে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন। এই গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে শিশু সুরক্ষা, মাদকবিরোধী সচেতনতা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির সুযোগ রয়েছে।

ধর্মমন্ত্রী বিশেষভাবে জুমার খুতবায় মাদক, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দেওয়ার জন্য ইমামদের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর মতে, সমাজে ইমামদের যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাই তাঁরা যদি সামাজিক অপরাধের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেন এবং মানুষকে সচেতন করেন, তাহলে অপরাধ প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।

তবে শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও জরুরি। মাদ্রাসাসহ আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সঙ্গে কারা দায়িত্ব পালন করছেন, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং শিশুদের নিরাপত্তা তদারকি কীভাবে হচ্ছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি থাকা প্রয়োজন। শিক্ষক, কর্মচারী, তত্ত্বাবধায়ক এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব স্পষ্ট করা হলে অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তারা ভয় বা লজ্জা ছাড়াই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কথা বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে জানাতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি কিংবা পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় শিশু ও তাদের অভিভাবকেরা অভিযোগ জানাতে দ্বিধা করেন। এই বাধা দূর করতে পরিবার, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের সংবেদনশীল ভূমিকা প্রয়োজন। শিশুর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাকে দোষারোপ না করা এবং তার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা ভুক্তভোগী শিশুকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে বা তাকে সামাজিকভাবে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। অভিযোগের তদন্ত চলাকালে শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ধর্মীয় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সৎ আচরণ গড়ে তোলা। তাই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের প্রতি নির্যাতন বা অশালীন আচরণের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা অপরিহার্য। এ ধরনের ঘটনায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের ভিত্তিতে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলে অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাও পুনর্গঠিত হতে পারে।

শনিবারের কাউন্সিল অধিবেশনে ইমাম সমিতির নেতারা নিজেদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি-দাওয়ার বিষয়ও তুলে ধরেন। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি ছিল তাঁদের আলোচনার অন্যতম বিষয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনকারী ইমামদের আর্থিক ও পেশাগত সমস্যাগুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁরা বক্তব্য দেন। তবে এসব দাবির বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

ইমামদের আর্থিক ও পেশাগত বাস্তবতা এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁদের দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে ধর্মীয় ও সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও সংগঠিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে শিশু সুরক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক উপকরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করাও কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে।

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ধর্মমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি এখন বাস্তব পদক্ষেপে কতটা প্রতিফলিত হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সচেতনতামূলক বক্তব্যের পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি, শিশু সুরক্ষাবিষয়ক নীতিমালা এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কোনো শিশু যেন শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নির্যাতন বা ভয়ভীতির শিকার না হয়, সেটিই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান অগ্রাধিকার।

শিশুদের নিরাপদে বেড়ে ওঠার অধিকার নিশ্চিত করা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেও সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটবে এবং শিশুদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন থাকবে। ধর্মমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এখন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, শিশুদের সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপও জোরদার করা হবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ফ্ল্যাট থেকে যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রমিক ইউনিয়নে বহাল সজীব, মামলার পরও গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ঠেকাতে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, উদ্বেগ বাড়ছে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সরকারের ভুলের দায় বিরোধী দল নেবে কেন: শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

শ্রমিক ইউনিয়নে বহাল সজীব, মামলার পরও গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ঠেকাতে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, উদ্বেগ বাড়ছে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সরকারের ভুলের দায় বিরোধী দল নেবে কেন: শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাহজালাল মাজারের দানের টাকা আপাতত ব্যাংকেই জমা হবে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হেফাজতের তত্ত্বাবধানে একসঙ্গে কাজ করবে ৭ ইসলামী দল

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সৌদির কারাগারে সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি, রায়ের অপেক্ষায় ঢাকা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ