প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জে বাস-মিনিবাস, কোচ ও মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সজীব আলী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, শ্রমিক সংগঠনের সদস্য এবং সাধারণ মানুষের একাংশের অভিযোগ, তিনি প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন, অথচ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, মামলায় তাঁর অবস্থান ও আন্দোলনে সম্পৃক্ততার বিষয়টি যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হবিগঞ্জের পরিবহন শ্রমিক সংগঠনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন সজীব আলী। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি শ্রমিক ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর অবস্থানকে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। শ্রমিকদের একটি অংশের দাবি, ইউনিয়নের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর প্রভাব বজায় রয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, অতীতের ক্ষমতাকেন্দ্রিক সম্পর্ক এবং সংগঠনের পদ ব্যবহার করে তিনি নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা।
সজীব আলী হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৩ সালে সরাসরি ভোটে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পরবর্তী সময়ে যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের অনুমোদিত কমিটিতে তাঁর সহসভাপতি পদে থাকার কথা বলা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর অবস্থান তাঁকে স্থানীয় রাজনৈতিক ও শ্রমিক অঙ্গনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে পরিচিত করেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার দুটি মামলায় সজীব আলী এজাহারভুক্ত আসামি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দোলনসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হবিগঞ্জ জেলা শহরে ছাত্র আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের দাবি, ওই সময়ের বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ স্থানীয়দের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এসব উপাদানের সত্যতা, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং মামলায় অভিযোগের প্রকৃতি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই সময় বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু সজীব আলী নিজেকে পুরোপুরি আড়াল না করে দলীয় তৎপরতা অব্যাহত রেখেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরে স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকার মাধ্যমে দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কেউ কেউ এই ঘোষণাকে গ্রেপ্তার এড়ানোর কৌশল বলে দাবি করেছেন। তবে পদত্যাগের ঘোষণার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখানে নেই।
রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াও পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষের অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনের কয়েকজন শ্রমিক নেতা ও সাধারণ সদস্যের দাবি, ইউনিয়নের কার্যক্রমে সাধারণ শ্রমিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। তাঁদের অভিযোগ, সংগঠনের নেতৃত্ব একটি নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে একক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের জবাবদিহি, নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং সদস্যদের অধিকার নিশ্চিত না হলে অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়েও বিরোধের অভিযোগ সামনে এসেছে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রতিপক্ষ প্যানেলকে পরাজিত করার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে শ্রম আদালতে মামলা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন তাঁরা। তবে মামলার বর্তমান অবস্থা, আদালতের আদেশ কিংবা নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য না থাকায় অভিযোগগুলোর আইনি অবস্থান নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট নথি, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং আদালতের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রমিক শাহিন ভান্ডারীকে ঘিরেও একটি অভিযোগ সামনে এসেছে। শ্রমিকদের দাবি, পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁকে দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগটি সত্য হলে তা শ্রমিকের আর্থিক অধিকার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল, অভিযোগের নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারের পতনের পর সজীব আলী এক বছরের ছুটিতে থাকার বিষয়ে লিখিত ঘোষণা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন শ্রমিক নেতা দিয়ারিছ মিয়া। তাঁর অভিযোগ, ছুটিতে থাকার কথা জানানো হলেও সজীব আলী প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা হারে মোট তিন লাখ টাকা ভাতা নিয়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য কারণ দেখিয়ে আরও প্রায় এক লাখ টাকা এবং কল্যাণ তহবিলের বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি। এসব অর্থ উত্তোলন, ভাতার বৈধতা এবং কল্যাণ তহবিল পরিচালনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হিসাবপত্র ও অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে শ্রমিক সংগঠনের আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সদস্যদের অর্থের সুরক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠতে পারে।
এদিকে হবিগঞ্জ জেলা যুবদলের আহ্বায়ক জালাল আহমেদ এবং সদর উপজেলা বিএনপির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মো. উজ্জ্বল মিয়া সজীব আলীর প্রকাশ্যে চলাফেরা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি জেলা যুবলীগের নেতাদের অর্থায়ন করে রাজনৈতিক মিছিল আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা থাকার পরও গ্রেপ্তার না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা তাঁকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্যের পাশাপাশি অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল হক জানিয়েছেন, সজীব আলী উল্লেখিত মামলাগুলোর এজাহারনামীয় আসামি কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে তাঁকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। পুলিশের এই বক্তব্যে মামলার নথি যাচাই এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে মামলার প্রকৃত অবস্থা, তদন্তের অগ্রগতি এবং গ্রেপ্তারসংক্রান্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক অবস্থান যেন তদন্তের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার না করে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে মামলা থাকা মানেই কোনো ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন—এমন নয়। অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকেরই আইনগত অধিকার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। তাই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য প্রকাশ, অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের জবাব দেওয়া জরুরি।
পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের চাঁদা, কল্যাণ তহবিল, ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের হিসাব নিয়মিতভাবে যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ সহজ হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী বিরোধ ও নেতৃত্বসংক্রান্ত অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি শ্রমিকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। সংগঠনের পদকে ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা উচিত, যাতে সাধারণ শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়।
সব মিলিয়ে, হবিগঞ্জে সজীব আলীকে ঘিরে রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের অঙ্গনে একাধিক অভিযোগ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলার অবস্থান, আন্দোলনের সময়কার ভূমিকা, শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন এবং কল্যাণ তহবিলের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ—প্রতিটি বিষয়ই পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও স্থানীয়দের প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তের অগ্রগতি ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


