সরকারের ভুলের দায় বিরোধী দল নেবে কেন: শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

একটার পর একটা অঘটন ঘটতে থাকলে বিরোধী দল কি নীরব থাকবে—এমন প্রশ্ন তুলে সরকারের ভুল ও অনিয়মের দায় বিরোধী দল কেন নেবে, তা জানতে চেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, সংসদে দায়িত্বশীল ও বিবেকবান বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করতে চান তারা। সরকারের ভালো উদ্যোগে সমর্থন থাকবে, তবে ভুল, অনিয়ম কিংবা জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতেও তারা পিছপা হবেন না।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসে জেলার কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। এ সময় তিনি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রশাসনের দলীয়করণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নিজের মত তুলে ধরেন।

বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে, যেখানে সরকারি দলের সব কর্মকাণ্ডকে ভালো এবং বিরোধী দলের সব কর্মকাণ্ডকে খারাপ হিসেবে দেখানো হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি দল কোনো সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য দেওয়ার আগেই বিরোধী দল সেটিকে সমর্থন করে বসত। তিনি মনে করেন, এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক নয়।

বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী সংসদের প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্বে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরোধী দলের সামনে দুটি চরম অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা থাকতে পারে। একদিকে কেউ চান বিরোধী দল সংসদে ভাঙচুর ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করুক, অন্যদিকে সরকারি দল চাইতে পারে বিরোধী দল সব বিষয়ে সমর্থন দিয়ে যাক। কিন্তু তাদের দল এ দুই অবস্থানের কোনোটিই গ্রহণ করতে চায় না।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের ভালো কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করা। একই সঙ্গে সরকারের ভুল, অনিয়ম কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা এবং সমালোচনা করাও বিরোধী দলের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। কোনো অঘটন ঘটলে চুপ করে থাকার মাধ্যমে সেই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শফিকুর রহমান বলেন, পুলিশের মধ্যে অনেক দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং মাদক নির্মূলে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজের মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।

দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান তিনি। তাঁর মতে, দুর্নীতিবাজ কিংবা চাঁদাবাজ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়। বরং এসব ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত যে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, সেই দলকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেন। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, অনেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাঁর বক্তব্য, নীতির প্রশ্নে কাউকে বড় করে দেখার সুযোগ নেই। কেউ ভুল করলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু অপরাধ করলে তা উপেক্ষা বা ছাড় দেওয়া উচিত নয়।

নিজ দলের এক সংসদ সদস্যকে বহিষ্কারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ওই সংসদ সদস্যকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে তাঁরা ২৪ ঘণ্টাও সময় নেননি। বহিষ্কারের পর তাঁর সঙ্গে দলের আর কোনো সম্পর্ক নেই বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা ও নীতির প্রশ্নে তাঁরা কোনো ধরনের আপস করতে চান না বলে জানান।

প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণের অভিযোগ নিয়েও কথা বলেন শফিকুর রহমান। জেলা পরিষদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, নির্বাচিত বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পরিবর্তে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাময়িকভাবে দায়িত্ব দেওয়া যেত কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে সরকারি কর্ম কমিশন বা পিএসসিকে দলীয়করণের অভিযোগের বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, দেশের কোথায় কী ঘটছে, তা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার পেছনে সংবাদমাধ্যমেরও কোনো কোনো অংশের ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাংবাদিকদের আরও সাহসী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, সাংবাদিকদের চারটি চোখ থাকতে হবে। দেশের স্বার্থ, জনগণের অধিকার এবং সত্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে আরও দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক চাপ কিংবা অন্য কোনো ধরনের প্রভাবের বাইরে থেকে সংবাদ পরিবেশনের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

দেশকে সব মানুষের উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশ একটি বহুমাত্রিক সমাজ এবং এখানে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকা প্রয়োজন। দেশের সব রাজনৈতিক দল ও সব ধর্মের মানুষ যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত সবার প্রত্যাশা।

সম্প্রতি দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ ভালো থাকলে সবাই ভালো থাকবে। ধর্ম, মত কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও নাগরিক হিসেবে সবার নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে কাজ করা।

সৌদি আরবের কারাগারে সাত হাজারের বেশি বাংলাদেশি বন্দী থাকার প্রসঙ্গও আসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে। শফিকুর রহমান বলেন, সৌদি আরবের নিজস্ব আইন রয়েছে এবং সেই আইন অনুযায়ী বন্দীদের বিচার হবে। তবে এসব বাংলাদেশি নাগরিকের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করা উচিত। তাঁরা ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি না, তাঁদের সঙ্গে যথাযথ আচরণ করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় জানার দায়িত্বও সরকারের রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও নিজের দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন জামায়াত আমির। তিনি জানান, জোটগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের নেই। অতীতেও তাঁরা এভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেননি। আগামীতে জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নির্বাচনে কীভাবে অংশ নেওয়া হবে, তা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

মৌলভীবাজারে সাংবাদিকদের সঙ্গে এই মতবিনিময়ে শফিকুর রহমানের বক্তব্যে মূলত বিরোধী দলের দায়িত্ব ও সরকারের জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধী দল শুধু সরকারের বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করবে না, আবার সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে চোখ বন্ধ করে সমর্থনও দেবে না। বরং জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে ভালো উদ্যোগে সহযোগিতা এবং ভুল সিদ্ধান্তে সমালোচনা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনীতি গড়ে তুলতে চান তারা।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক সম্পর্ক, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ—এসব বিষয় এখন জনআলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমন প্রেক্ষাপটে শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর সংসদ ও রাজনৈতিক পরিসরে নজরদারি বাড়ানোর বার্তা যেমন রয়েছে, তেমনি বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের প্রত্যয়ের কথাও উঠে এসেছে। তাঁর ভাষায়, দেশের স্বার্থে প্রয়োজন হলে সরকারকে সমর্থন করা হবে, আবার ভুল হলে প্রশ্ন তোলা থেকেও বিরত থাকা হবে না।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ফ্ল্যাট থেকে যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রমিক ইউনিয়নে বহাল সজীব, মামলার পরও গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ঠেকাতে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

প্রকাশ:২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, উদ্বেগ বাড়ছে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

শ্রমিক ইউনিয়নে বহাল সজীব, মামলার পরও গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ঠেকাতে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

প্রকাশ:২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, উদ্বেগ বাড়ছে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাহজালাল মাজারের দানের টাকা আপাতত ব্যাংকেই জমা হবে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হেফাজতের তত্ত্বাবধানে একসঙ্গে কাজ করবে ৭ ইসলামী দল

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সৌদির কারাগারে সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি, রায়ের অপেক্ষায় ঢাকা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ