প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে গত ২৪ ঘণ্টার মৃত্যুর তথ্য। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১৪৬ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে একদিকে যেমন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে হাসপাতালে রোগীর চাপও অব্যাহত রয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হামের পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, চলতি বছরে সিলেট বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৪ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছে ১০ শিশু। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৫৪ শিশুর।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে দুজন সিলেট জেলার বাসিন্দা। তাদের বাড়ি কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলায়। অপর দুজনের একজন সুনামগঞ্জের এবং অন্যজন হবিগঞ্জের বাসিন্দা। শিশুদের মধ্যে তিনজন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং একজন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।
চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত শিশুদের শরীরে হামের উপসর্গের পাশাপাশি অপুষ্টি ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতাও ছিল। ফলে কেবল হামের সংক্রমণ নয়, শিশুদের সামগ্রিক শারীরিক দুর্বলতা ও জটিলতাও তাদের চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলেছিল। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং নিবিড় চিকিৎসা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সিলেটে হামের পরিস্থিতি যে এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি, নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যাও তার বড় ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১৪৬ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪৯৫ জন।
তবে একই সময়ে নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে কারও শরীরে হাম নিশ্চিত হয়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। অর্থাৎ হাসপাতালে হামের মতো উপসর্গ নিয়ে রোগী আসার প্রবাহ অব্যাহত থাকলেও ওই সময়ের পরীক্ষায় নতুন নিশ্চিত হাম শনাক্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
সিলেটে হামের পরিস্থিতি কয়েক মাস ধরেই স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এর আগে আগস্টের শেষ দিকে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতেও একাধিক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর খবর এসেছে। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ১৫৪-তে পৌঁছেছিল বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়।
এরপরও পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি হয়নি। ৫ সেপ্টেম্বর আরও দুই শিশুর মৃত্যুর পর মৃতের সংখ্যা ১৫৭-এ পৌঁছায়। ৮ সেপ্টেম্বর এক শিশুর মৃত্যুর পর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫৯-এ এবং ১০ সেপ্টেম্বর আরও একজনের মৃত্যুতে তা ১৬০-এ ওঠে। সাম্প্রতিক চার মৃত্যুর পর সংখ্যাটি এখন ১৬৪।
এই ধারাবাহিকতা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোকে একই সঙ্গে নতুন রোগী ভর্তি, গুরুতর রোগীদের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার কাজ করতে হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হওয়া এবং ৪৯৫ জনের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য পরিস্থিতির ব্যাপ্তি বোঝায়।
হামের মতো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশুর পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং আশপাশের মানুষের মধ্যেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শিশুদের অপুষ্টি থাকলে বা আগে থেকেই অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে রোগের প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। তাই শুধু আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবার ও সম্প্রদায় পর্যায়েও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কার্যকর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট বিভাগের প্রত্যন্ত ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকেও রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য নগরের হাসপাতালগুলোতে আসছেন। কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাম্প্রতিক মৃত শিশুদের হাসপাতালে আসার তথ্য থেকে বোঝা যায়, পরিস্থিতিটি শুধু সিলেট নগরকেন্দ্রিক নয়; বরং বিভাগের বিস্তৃত এলাকার শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে এটি সম্পর্কিত।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের স্বজনদের জন্যও সময়টি অত্যন্ত কঠিন। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে দিনের পর দিন হাসপাতালে অবস্থান, চিকিৎসার ব্যয়, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা পরিবারগুলোর ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকা আরও কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে।
এ অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিশুর শরীরে হামের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, অসুস্থ শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। তবে রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের পরামর্শেই হওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগমুক্ত নয়। একদিকে চলতি বছরে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ১৬৪-তে পৌঁছেছে, অন্যদিকে প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়নি, তবুও বিপুলসংখ্যক উপসর্গযুক্ত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা পরিস্থিতির গুরুত্ব কমিয়ে দেয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সময়মতো চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম একসঙ্গে জোরদার করা দরকার। পাশাপাশি কোন এলাকায় রোগীর সংখ্যা বেশি, কোন বয়সের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে অপুষ্টি বা অন্যান্য জটিলতার ভূমিকা কতটা—এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেটের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাই শুধু একটি দিনের চারটি মৃত্যুর খবর নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি জনস্বাস্থ্য সংকটের ধারাবাহিকতা। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি শিশুর অসমাপ্ত জীবন এবং স্বজনদের গভীর শোক। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা, সংক্রমণের বিস্তার কমানো এবং কোনো শিশুই যেন সময়মতো চিকিৎসার অভাবে ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে—তা নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরবর্তী তথ্যের দিকে এখন সিলেটবাসীর নজর থাকবে। নতুন রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসে কি না, নতুন করে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয় কি না এবং হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন শিশুদের পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়—এসবই আগামী দিনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠবে। তবে আপাতত ১৬৪ শিশুর মৃত্যু এবং ৪৯৫ শিশুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার তথ্যই সিলেটের চলমান স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তুলছে।


