প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) এক শিক্ষার্থীকে রাতে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ উঠেছে এক বহিরাগত যুবকের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও নিরাপত্তাকর্মীরা ওই যুবককে আটক করে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যান। পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ঘটনাটি ঘটেছে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত পৌনে ১১টার দিকে। অভিযুক্ত যুবকের নাম আনারুল মিয়া (২৭)। তিনি নেত্রকোনা জেলার বাসিন্দা এবং বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সুরমা আবাসিক এলাকায় বসবাস করে সিলেটে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, নগরীর একটি বাসায় টিউশনি শেষে তিনি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে এসে অটোরিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সে সময় অটোরিকশা না পাওয়ায় তিনি হেঁটেই আবাসিক হলে ফেরার পথে রওনা দেন। এ সময় একটি মোটরসাইকেল নিয়ে ওই যুবক তাকে অনুসরণ করতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একপর্যায়ে মোটরসাইকেলটি থামিয়ে ওই যুবক শিক্ষার্থীর কাছে তার মুঠোফোন নম্বর চান এবং বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় তাকে লক্ষ্য করে অশালীন কথাবার্তা ও অশোভন অঙ্গভঙ্গিও করা হয়। রাতের নির্জন পথে এমন পরিস্থিতিতে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত সহপাঠীদের ফোন করে বিষয়টি জানান।
খবর পেয়ে তার কয়েকজন সহপাঠী ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীরাও সেখানে পৌঁছান। পরে অভিযুক্ত যুবককে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ তুলে ধরেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগীর এক সহপাঠী জানান, রাতের দিকে তার বন্ধু কান্না করতে করতে ফোন করে জানান যে একজন মোটরসাইকেল নিয়ে তাকে অনুসরণ করছেন এবং শিস ও বিভিন্ন অশোভন আচরণের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করছেন। খবর পাওয়ার পর তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের ওই মোটরসাইকেল আরোহীকে আটক অবস্থায় দেখতে পান। পরে তাকে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে নেওয়ার পর অভিযুক্ত যুবক তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বীকার করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য বা আত্মপক্ষ সমর্থনের বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে তাকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে অভিহিত না করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান জানান, অভিযুক্ত যুবককে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
এদিকে সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা ফারুক মিয়া বাদী হয়ে থানায় মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু করেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামসুল হাবিব। তবে মামলাটি কোন ধারায় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কী অবস্থায় রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নও তুলেছে ঘটনাটি। বিশেষ করে টিউশনি, ব্যক্তিগত কাজ কিংবা অন্যান্য প্রয়োজন শেষে রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরেন অনেক শিক্ষার্থী। তাদের একটি অংশকে ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক থেকে আবাসিক হল পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়। ফলে রাতের সময়ে ক্যাম্পাসের প্রবেশপথ, আশপাশের সড়ক এবং আবাসিক হলমুখী পথের নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক।
এর আগেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় বহিরাগতদের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের মে মাসেও শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসের কিলোরোড এলাকায় নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে দুই বহিরাগতকে আটক করা হয়েছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সামনে আসায় ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষ বা আবাসিক হলের সমষ্টি নয়; শিক্ষার্থীদের নিরাপদে চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর প্রশাসনিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা যেন কোনো ধরনের হয়রানি বা ভয়ভীতির শিকার না হন, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু ঘটনার পর অভিযুক্তকে আটক করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে নজরদারি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, নিরাপত্তাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা গেলে এমন ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কোনো শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হলে দ্রুত অভিযোগ জানানোর সহজ ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকাও জরুরি।
এই ঘটনায় একটি ইতিবাচক দিক হলো, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ভয় বা অস্বস্তির মধ্যে বিষয়টি গোপন না রেখে সহপাঠীদের জানিয়েছেন। সহপাঠীরাও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করেছেন। ফলে অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি দ্রুত প্রশাসনের নজরে আসে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগোয়।
অন্যদিকে, এমন ঘটনায় সামাজিক প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নারী শিক্ষার্থীকে অনুসরণ করা, অনিচ্ছা সত্ত্বেও যোগাযোগের জন্য চাপ দেওয়া, অশালীন মন্তব্য কিংবা অশোভন আচরণকে ‘দুষ্টুমি’ বা ‘সাধারণ বিষয়’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখানো সামাজিক দায়িত্বের পাশাপাশি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বেরও অংশ।
শাবিপ্রবি প্রশাসন জানিয়েছে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের কাছে অভিযুক্তকে সোপর্দ করার পর এখন অভিযোগের আইনগত প্রক্রিয়াই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের কাছে জ্ঞানচর্চা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের জায়গা। সেখানে দিনের ব্যস্ততার বাইরে রাতের পথেও একজন শিক্ষার্থী যেন নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারেন, সেটিই প্রত্যাশিত। শাবিপ্রবির সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু একটি উত্ত্যক্তের অভিযোগ হিসেবে নয়, বরং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ এবং হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবেও সামনে এসেছে।


