প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে প্রায় এক কোটি ছয় লাখ টাকা মূল্যের ভারতীয় চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। জব্দ করা পণ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি, কসমেটিকস, মদ ও গাঁজা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। শনিবার বিকেলে বিজিবির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানানো হয়।
সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মাদক ও অবৈধ পণ্য পরিবহন বন্ধে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। অভিযানে উদ্ধার হওয়া পণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় এক কোটি ছয় লাখ টাকা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৫৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের একটি বিশেষ টহলদল মাধবপুর উপজেলার ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়কের সুরমা চা-বাগান এলাকায় অবস্থান নেয়। সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের অবৈধ পণ্য পরিবহনের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় সন্দেহজনক যানবাহনের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়।
একপর্যায়ে টহলদল একটি ড্রাম ট্রাককে সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত করে। পরে ট্রাকটিতে তল্লাশি চালানো হলে বালির নিচে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য উদ্ধার করা হয়। বাইরে থেকে ট্রাকটিতে বালি পরিবহন করা হচ্ছে বলে মনে হলেও তল্লাশির সময় এর ভেতরে লুকানো পণ্যগুলোর সন্ধান পাওয়া যায় বলে বিজিবি জানিয়েছে।
তল্লাশিতে ভারতীয় শাড়ি ও বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনসামগ্রী উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে মদ ও গাঁজাসহ মাদকদ্রব্যও জব্দ করা হয়েছে। পণ্যগুলো কীভাবে সীমান্ত এলাকা অতিক্রম করে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল এবং এগুলো কোথায় নেওয়া হচ্ছিল, তা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরবর্তী তদন্ত ও আইনি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উদ্ধার হওয়া পণ্য ও মাদকদ্রব্য প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং চোরাচালান নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজও করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে দেশে প্রবেশের কারণে সরকার যেমন রাজস্ব হারায়, তেমনি স্থানীয় বৈধ ব্যবসা ও বাজার ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে শাড়ি, প্রসাধনসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের অবৈধ প্রবেশ বৈধ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়।
সীমান্ত এলাকার দুর্গম পথ, নদী, চা-বাগান ও বিভিন্ন আড়ালকে কাজে লাগিয়ে চোরাচালানকারীরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অবৈধ পণ্য সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোরাচালানের কৌশলেও পরিবর্তন আসছে। মাটির নিচে, বালির স্তরের আড়ালে কিংবা বৈধ পণ্যবাহী যানবাহনের সঙ্গে অবৈধ পণ্য পরিবহনের মতো কৌশল ব্যবহার করার অভিযোগ বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে।
মাধবপুরের সাম্প্রতিক অভিযানে বালির নিচে পণ্য লুকিয়ে রাখার বিষয়টি সেই কৌশলেরই একটি উদাহরণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। তবে উদ্ধার হওয়া পণ্যের প্রকৃত উৎস, পরিবহনকারী এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
৫৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজিলুর রহমান জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চোরাচালান ও মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করতে বিজিবির অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে। সীমান্ত দিয়ে যাতে অবৈধ পণ্য প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
সীমান্ত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, চোরাচালান বন্ধে শুধু সীমান্তে পণ্য আটক করাই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে জড়িত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করা জরুরি। সীমান্ত থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবহনকারী, মজুতকারী ও বিক্রয় নেটওয়ার্কের ভূমিকা থাকতে পারে। তাই একটি চালান জব্দের পাশাপাশি এর পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো শনাক্ত করা গেলে চোরাচালান প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।
মাধবপুরের এই অভিযানে প্রায় এক কোটি ছয় লাখ টাকা মূল্যের পণ্য জব্দের ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নজরদারির গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে বৈধ পণ্য পরিবহনের আড়ালে অবৈধ মালামাল স্থানান্তরের চেষ্টা ঠেকাতে মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথে তল্লাশি কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ মনে করছেন, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান বন্ধ হলে বৈধ ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তরুণ সমাজকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রেও সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।
তবে জব্দ করা পণ্যগুলোর সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে সেগুলো সীমান্ত অতিক্রম করেছে এবং কোথায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। অভিযানে কোনো ব্যক্তি আটক হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাধবপুরে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য উদ্ধারের এ ঘটনা সীমান্ত এলাকায় অবৈধ বাণিজ্য ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার গুরুত্ব আরও একবার সামনে এনেছে।


