ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি ঘিরে বিতর্ক, ভাঙচুর

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের সংস্কার করা সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। ছবি প্রদর্শনের এক দিনের মধ্যেই সোমবার দুপুরে সংগ্রহশালায় ঢুকে জিন্নাহর একটি ছবি নামিয়ে ভাঙচুর করেছেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে এক শিক্ষার্থী। ঘটনাটি ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে এবং ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে আবু তৈয়ব হাবিলদার ডাকসু ভবনের সংগ্রহশালায় প্রবেশ করেন। সেখানে প্রদর্শিত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একটি ছবি তিনি খুলে নেন। এরপর ছবিটির ফ্রেম ভেঙে সেটি ছিঁড়ে ফেলেন বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ঘটনাটি ডাকসু ভবনে উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রত্যক্ষ করেন।

আবু তৈয়ব হাবিলদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ডাকসু নির্বাচনেও তিনি আলোচিত প্রার্থী ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের তথ্যে জানা যায়, তিনি ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষে উর্দু বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ বিরতির পর আবার পড়াশোনায় ফিরেছেন। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে তিনি বয়সের দিক থেকে আলোচিত ভিপি প্রার্থী ছিলেন।

ঘটনাটির সূত্রপাত মূলত এক দিন আগে, রোববার সংস্কার শেষে ডাকসু সংগ্রহশালাটি নতুনভাবে উদ্বোধনের পর। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ডাকসুর দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সংগ্রহশালাটি সংস্কার করা হয়। উদ্বোধনের পর সেখানে প্রদর্শিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ছবি ও দলিল নতুন করে জনসমক্ষে আসে।

নতুনভাবে সাজানো সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একাধিক ছবি স্থান পাওয়ার বিষয়টি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া জিন্নাহর ভাষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছবিটি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ওই ভাষণে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে এই বক্তব্য গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে।

সংগ্রহশালায় জিন্নাহর যে ছবিগুলো রাখা হয়েছিল, তার মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চের রেসকোর্স ময়দানের অনুষ্ঠানের ছবি ছাড়াও ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনের একটি গ্রুপ ছবিতে তার উপস্থিতি এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত একটি পত্রিকার কাটিংয়ের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে বিতর্কের মূল জায়গা শুধু জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নয়; বরং একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ছবিগুলোর অনুপস্থিতিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগ্রহশালায় আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি আতাউল গণি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবি রয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি সেখানে রাখা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের নিন্দা জানিয়ে প্রতিবাদ করেছে। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো উপস্থাপন ডাকসুর ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় থাকা উচিত নয়। তাদের বক্তব্যে ১৯৪৮ সালের জিন্নাহর ভাষণ এবং পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে, ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি সরিয়ে সেখানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছবি রাখার দাবি জানানো হয়েছে। এ অবস্থায় বিষয়টি কেবল একটি ছবির প্রদর্শন বা অপসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কীভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে ডাকসু সংগ্রহশালা কেবল একটি প্রদর্শনীস্থল নয়; এটি শিক্ষার্থীদের কাছে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের একটি দৃশ্যমান স্মারক হিসেবেও বিবেচিত। অতীতের ঘটনাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হচ্ছে, কোন ব্যক্তির ছবি রাখা হচ্ছে এবং কোন ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয় স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দিতে পারে।

বিশেষ করে জিন্নাহর মতো বিতর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক ভূমিকা, ভাষা-সংক্রান্ত অবস্থান এবং উপমহাদেশের ইতিহাসে তার প্রভাবের পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তার সম্পর্কও ব্যাখ্যা করে উপস্থাপন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিহাসের কোনো চরিত্রকে শুধু শ্রদ্ধা বা নিন্দার একমাত্রিক কাঠামোয় না দেখে তার সময়কাল, রাজনৈতিক অবস্থান এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক প্রভাবের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করাই একটি সংগ্রহশালার দায়িত্বশীল পদ্ধতি হতে পারে।

তবে ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে সংগ্রহশালায় ঢুকে সেটি ভাঙচুরের ঘটনাও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কোনো ঐতিহাসিক উপস্থাপন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা নিয়ে প্রশাসনিক বা সাংগঠনিকভাবে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একটি সংগ্রহশালার প্রদর্শিত সামগ্রী ভাঙচুর করা সেই বিতর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক নিদর্শন ও সংরক্ষণব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট মহলে এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক উপাদান নির্বাচনের নীতি এবং সামগ্রিক উপস্থাপনার ভারসাম্য। এরই মধ্যে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। তবে ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাটির বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে আড়াল না করে সেগুলো সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে সেই ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তার প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডাকসুর সংগ্রহশালাকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে—ইতিহাস কি শুধু ছবি দিয়ে সংরক্ষণ করা যায়, নাকি প্রতিটি ছবির সঙ্গে সময়, প্রেক্ষাপট এবং তার ঐতিহাসিক তাৎপর্যও তুলে ধরা প্রয়োজন?

এই বিতর্কের শেষ কোথায়, তা এখনই বলা কঠিন। তবে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছবির অনুপস্থিতি এবং পরদিনই একটি ছবি ভাঙচুরের ঘটনায় ডাকসু সংগ্রহশালা যে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় এসেছে, সেটি স্পষ্ট। ইতিহাসের স্মৃতিকে রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে রেখে কতটা তথ্যনির্ভর, ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীলভাবে সংরক্ষণ করা যায়—আগামী দিনে ডাকসু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য সেটিই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

হামলার পর টিমের বিরুদ্ধেই বাঁধনের অভিযোগ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হামের উপসর্গে একদিনে ৪ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে সিলেটে বাড়তি নিরাপত্তা

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্তের অভিযোগ, যুবক আটক

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আরও ৫০ মামলা বিচারাধীন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

হামলার পর টিমের বিরুদ্ধেই বাঁধনের অভিযোগ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হামের উপসর্গে একদিনে ৪ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে সিলেটে বাড়তি নিরাপত্তা

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্তের অভিযোগ, যুবক আটক

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আরও ৫০ মামলা বিচারাধীন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হবিগঞ্জে কোটি টাকার ভারতীয় চোরাচালান জব্দ

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মন্ত্রিসভায় বড় রদবদলের আভাস, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় পরিবর্তন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইন্দোনেশিয়ায় ৬.৬ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

প্রকাশ:  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ