কলকাতার হোটেলে আগুন, ৯ বাংলাদেশির প্রাণহানি

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত সবাই বাংলাদেশি নাগরিক এবং চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। বুধবার ভোররাতে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন লাগার পর হোটেলের বিভিন্ন কক্ষে দ্রুত ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় বেশ কয়েকজন অতিথি ভেতরে আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন।

প্রাথমিকভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে। ফলে এসি বিস্ফোরণের বিষয়টি আপাতত প্রাথমিক সন্দেহ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

ঘটনাটি ঘটে কলকাতার অত্যন্ত ব্যস্ত ও জনবহুল নিউমার্কেট এলাকার কাছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে। বুধবার দিবাগত রাত প্রায় দুইটার দিকে হোটেলে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। খবর পাওয়ার পর দ্রুত কয়েকটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। উদ্ধার অভিযানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিশেষ দলও অংশ নেয়।

আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের ভেতরের পরিবেশ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন কক্ষে ধোঁয়া ঢুকে পড়ায় অতিথিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপদে বের হওয়ার জন্য ছোটাছুটি শুরু করেন। কিন্তু ধোঁয়ার ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে, হোটেলের ওপরের তলাগুলোতে পৌঁছানো উদ্ধারকারীদের জন্যও কঠিন হয়ে পড়ে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা একদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন, অন্যদিকে ভবনের ভেতরে আটকে থাকা অতিথিদের বের করে আনার অভিযান চালান। দীর্ঘ সময়ের প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর ভবনের ভেতরের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালিয়ে হতাহতদের সন্ধান করা হয়।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘন ধোঁয়ার কারণে দমকলকর্মীদের সিঁড়ি দিয়ে ওপরের তলাগুলোতে ওঠার ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আগুনের চেয়েও ধোঁয়া অনেক সময় বেশি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। হোটেলের কক্ষগুলোতে ধোঁয়া জমে যাওয়ায় অতিথিদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হোটেলের তৃতীয় তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। সেখানে এসি বিস্ফোরণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণেও আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তদন্তের পরই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নিহতদের সবাই বাংলাদেশি নাগরিক বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাঁরা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় অবস্থান করছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একটি শিশুসহ নয়জন মানুষের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি করেছে।

চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিবছর কলকাতায় যান। বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার সুবিধার জন্য অনেকেই নিউমার্কেট, পার্ক স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকায় হোটেল বা আবাসিক স্থাপনায় অবস্থান করেন। ফলে কলকাতার হোটেলগুলোতে বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অবস্থান করা অস্বাভাবিক নয়। শিখা ইন হোটেলের দুর্ঘটনায় বাংলাদেশিদের প্রাণহানির ঘটনায় সেই বাস্তবতাই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঘটনার পর হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একটি বহুতল আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের সময় অতিথিদের দ্রুত বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন পথ, কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং ধোঁয়া শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গভীর রাতে যখন অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে থাকেন, তখন আগুন শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ডের মাত্র দুই দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠেও একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুনে অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজ্যের দুটি হোটেলে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

১৭ আগস্ট ভোরে তারাপীঠের ‘হোটেল বিদেশিনী’তে আগুন লাগে। পাঁচতলা ভবনটির নিচতলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। আগুন লাগার সময় অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। ফলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে দ্রুত ভবন থেকে বের হতে পারেননি।

তারাপীঠের ওই অগ্নিকাণ্ডেও একটি পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারান। মেঘালয় থেকে আসা একটি পরিবারের দুই শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তাঁরা হোটেলের ওপরের তলায় অবস্থান করছিলেন। আগুনের বিষয়টি বুঝতে পেরে পরিবারের সদস্যরা শিশুদের নিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আগুন ও ধোঁয়ার কারণে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। পরে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তারাপীঠের ঘটনায় আহতদের উদ্ধার করে রামপুরহাট সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে কলকাতায় বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানি এবং তারাপীঠে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের মৃত্যুর ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

হোটেল অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সাধারণত আগুনের পাশাপাশি ধোঁয়া, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং অতিথিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্বকে দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অতিথিরা ভবনের ভেতরে আগুনের উপস্থিতি টের পাওয়ার আগেই ধোঁয়ায় আটকা পড়ে যান। বিশেষ করে রাতের সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

শিখা ইন হোটেলের ঘটনাতেও ঘন ধোঁয়া উদ্ধার অভিযানে বড় বাধা তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। ফলে ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, জরুরি অবস্থায় অতিথিদের বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না এবং আগুনের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সতর্কতা জারি হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিহত ও আহতদের বিষয়ে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। একই সঙ্গে আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

চিকিৎসার আশায় বিদেশের মাটিতে গিয়ে একটি হোটেলে রাত কাটাতে গিয়ে যারা প্রাণ হারালেন, তাঁদের পরিবারের কাছে এই মৃত্যু কোনোভাবেই সহজে মেনে নেওয়ার মতো নয়। বিশেষ করে একটি শিশুর প্রাণহানি ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। স্বজনদের কাছে এখন একদিকে যেমন প্রিয়জন হারানোর শোক, অন্যদিকে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা ও পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার বাস্তব চ্যালেঞ্জ।

কলকাতার এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি আবাসিক হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বও নতুন করে সামনে এনেছে। আগুনের প্রকৃত কারণ তদন্তে বেরিয়ে আসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই এখন প্রত্যাশা। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

কারামুক্ত সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আইনি বাধা নেই

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

খাসি কাণ্ডে বিয়ে ভাঙা জাপানপ্রবাসীর ফের বিয়ে

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

স্বামীর মৃত্যুতে ১২ ঘণ্টার প্যারোলে দীপু মনি

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাংলাদেশিদের জন্য যুক্তরাজ্যে বাড়ছে বৈধ কর্মপথ

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

কারামুক্ত সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আইনি বাধা নেই

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

খাসি কাণ্ডে বিয়ে ভাঙা জাপানপ্রবাসীর ফের বিয়ে

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

স্বামীর মৃত্যুতে ১২ ঘণ্টার প্যারোলে দীপু মনি

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাংলাদেশিদের জন্য যুক্তরাজ্যে বাড়ছে বৈধ কর্মপথ

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হবিগঞ্জে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা শরিফুল গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আপত্তি ও নিবন্ধন জটিলতায় কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিল

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হবিগঞ্জে ধানখেতে রক্তাক্ত যুবকের মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ