প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
কলকাতার ব্যস্ত নিউ মার্কেট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন নয়জন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছরের ছেলে শর্ণশিষ দত্ত এবং আফসানার বাবা মো. আকরাম আলি। একই পরিবারের চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে কুষ্টিয়াজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
বুধবার গভীর রাতে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেল ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আগুনে এখন পর্যন্ত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। উদ্ধার অভিযান শেষে মরদেহগুলো কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। নিহতদের পরিচয় শনাক্তের কাজও শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নিহত বাংলাদেশিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ঘটনাটি নতুন করে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি করেছে। কলকাতায় চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনের কারণে বাংলাদেশিদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। ফলে সেখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এবারের ঘটনায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া রাজারহাট এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। স্থানীয় সাংবাদিকতা অঙ্গনে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিলেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি তিনি জাতীয় পর্যায়ের একটি দৈনিকের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, অসুস্থ স্ত্রী আফসানা শারমীনের চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে যান দেবাশীষ। প্রথমে তারা বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসার জন্য অবস্থান করেন। সেখানে প্রায় ১৩ দিন চিকিৎসা শেষে ১৮ আগস্ট কলকাতায় ফেরেন। এরপর দেশে ফেরার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু ফেরার আগেই কলকাতার হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড তাদের পরিবারের চার সদস্যের জীবন কেড়ে নেয়।
স্বজনদের কাছে দেবাশীষের এই সফর ছিল মূলত চিকিৎসাকেন্দ্রিক। অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসা করিয়ে দ্রুত দেশে ফেরার পরিকল্পনাই ছিল পরিবারের। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে কলকাতায় ফিরে তারা হয়তো দেশে ফেরার শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু একটি রাতের আগুন সেই প্রত্যাশাকে পরিণত করেছে চরম শোক ও বেদনায়।
দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমীনের বয়স ছিল ২৭ বছর। তাদের ছেলে শর্ণশিষ দত্তের বয়স মাত্র তিন বছর। পরিবারের সঙ্গে থাকা আফসানার বাবা মো. আকরাম আলির বয়স ৬৪ বছর। অর্থাৎ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। একজন তরুণ মা, তার ছোট শিশু, শিশুটির বাবা এবং পরিবারের একজন প্রবীণ সদস্য—এক রাতেই নিভে গেছে চারটি জীবন।
দেবাশীষের পরিবারে আরও একটি আট বছর বয়সী কন্যাসন্তান রয়েছে। তাঁর বাবা-মাও জীবিত। ফলে একসঙ্গে চারজনকে হারানোর এই ঘটনায় পরিবারের ওপর যে শোক নেমে এসেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কুষ্টিয়ার বাড়িতে স্বজন, বন্ধু ও সহকর্মীরা জড়ো হলেও শোকাহত পরিবারের সদস্যদের অনেকের সঙ্গে কথা বলার মতো পরিস্থিতিও ছিল না বলে জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠজনেরা।
দেবাশীষের বন্ধু ও সাংবাদিক তৌহিদী হাসান জানান, মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তিনি দ্রুত দেবাশীষের বাড়িতে যান। সেখানে স্বজনদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও বন্ধুর এমন আকস্মিক মৃত্যু স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছেও গভীর আঘাত হয়ে এসেছে।
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক গাজী মাহবুব রহমান জানান, দেবাশীষ দত্ত সাংবাদিকতার পাশাপাশি একটি স্থানীয় দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় পর্যায়ের সংবাদমাধ্যমে কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলেন। ফলে কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতা অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি ছিল বিস্তৃত।
কলকাতার যে ভবনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে, সেটি কেন্দ্রীয় কলকাতার ব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত। ভবনটিতে একাধিক হোটেল বা আবাসিক স্থাপনা ছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আগুন রাতের দিকে ছড়িয়ে পড়ায় অনেক অতিথি ঘুমন্ত অবস্থায় আটকা পড়েন। ভবনের বিভিন্ন অংশে ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করা হলেও কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়।
প্রাথমিকভাবে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা এসি-সংক্রান্ত সমস্যার কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে। কর্তৃপক্ষ ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, উদ্ধারপথ এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখছে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
এই দুর্ঘটনা আবারও আবাসিক হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় থাকা হোটেলগুলোতে জরুরি নির্গমনপথ, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং অতিথিদের দ্রুত বের করে আনার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভবনটির কিছু কক্ষে জানালা না থাকার কারণে উদ্ধারকাজে জটিলতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনার তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শহরের হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। কারণ পর্যটক ও চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা মানুষের বড় একটি অংশ কম খরচের আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেন। এসব হোটেলে নিরাপত্তার মান নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু এই দুর্ঘটনাকে বাংলাদেশের জন্য আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। একজন সাংবাদিকের কর্মজীবনের পাশাপাশি তাঁর পারিবারিক জীবনও ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশায় ভরা। অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসা করিয়ে সন্তান ও শ্বশুরকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন আর হলো না।
নিহতদের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া এবং মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং স্বজনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলে জানা গেছে। নিহতদের পরিবারগুলোর জন্য এই মুহূর্তে দ্রুত ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।
একটি পরিবারের চারজন মানুষকে একসঙ্গে হারানোর এই ঘটনা শুধু একটি অগ্নিকাণ্ডের খবর নয়; এটি কয়েকটি পরিবারের জীবনে স্থায়ী শূন্যতার গল্প। কুষ্টিয়ার একটি বাড়িতে এখন অপেক্ষা করছে শোকাহত বাবা-মা, স্বজন ও সহকর্মীরা। আট বছরের একটি শিশুর কাছে তার বাবা, মা ও ছোট ভাইকে হারানোর বাস্তবতা যে কতটা নির্মম, তা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়।
কলকাতার ওই অগ্নিকাণ্ড তাই কেবল প্রাণহানির সংখ্যা দিয়ে বিচার করার মতো ঘটনা নয়। এটি নগরীর আবাসিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ প্রস্তুতি এবং বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তে প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারিত হওয়ার পর ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই এখন নিহতদের স্বজন ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।


