প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। বুধবার (১৯ আগস্ট) কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। কারা অধিদপ্তরের সূত্র তাঁর মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে রাজধানীর বনানী থানায় করা একটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তী জামিন পাওয়ার পর তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। এর আগে পৃথক কয়েকটি মামলায় জামিন পেলেও বনানী থানার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হওয়ায় কারাগারে থাকতে হয়েছিল।
আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় গত ১০ আগস্ট হাইকোর্ট খায়রুল হককে অন্তর্বর্তী জামিন দেন। এরপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বুধবার তাঁর মুক্তির পথ তৈরি হয়। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগার থেকেই তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খায়রুল হকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় আইনি কার্যক্রম চলছিল। পৃথক আটটি মামলায় জামিন পাওয়ার পরও বনানী থানার মামলাটি তাঁর কারামুক্তির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করে। এ মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য তদন্ত কর্মকর্তা গত ২ জুলাই আদালতে আবেদন করেন।
এরপর ৮ জুলাই আদালত তাঁকে বনানী থানার ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর অনুমতি দেন। এর ফলে অন্যান্য মামলায় জামিন পাওয়ার পরও তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পাননি। পরবর্তী সময়ে মামলাটিতে জামিনের জন্য নিম্ন আদালতে আবেদন করা হলে ২৭ জুলাই সেই আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।
নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর খায়রুল হকের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। ৯ আগস্ট হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা হয়। আবেদনের শুনানি শেষে পরদিন ১০ আগস্ট আদালত তাঁকে অন্তর্বর্তী জামিন দেন। হাইকোর্টের ওই আদেশের পর কারা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে বুধবার তিনি মুক্তি পান।
বনানী থানায় করা মামলাটির অভিযোগের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওই দিন রাজধানীর মহাখালী এলাকায় সেতু ভবনের সামনে আন্দোলনকারীরা অবস্থান করছিলেন। পরে তাঁরা শাহবাগের দিকে যাওয়ার সময় তাঁদের ওপর হামলা, গুলিবর্ষণ এবং ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় উজ্জ্বল মিয়াসহ ২৫ থেকে ৩০ জন আহত হন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আহত উজ্জ্বল মিয়া বনানী থানায় মামলা করেন। মামলায় হত্যাচেষ্টা এবং বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অভিযোগ আনা হয়।
মামলার অভিযোগের বিষয়ে আদালতে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে কোনো মামলায় আসামি হিসেবে নাম থাকা বা গ্রেপ্তার হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে। খায়রুল হকও মামলায় নিজের আইনগত অধিকার প্রয়োগ করে আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি হিসেবে এ বি এম খায়রুল হকের পরিচিতি দেশের বিচারাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কারাবন্দিত্ব ও পরবর্তী জামিনের বিষয়টি তাই আইনজীবী মহলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। বিশেষ করে একাধিক মামলায় জামিন পাওয়ার পর একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে তাঁর কারামুক্তি বিলম্বিত হওয়া বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
খায়রুল হক বাংলাদেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিচারিক জীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও রায় দেশের আইন ও রাজনীতির অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অবসরের পরও তাঁর বিভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হয়েছে।
বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর আইনি কার্যক্রম নিজস্ব গতিতে চলবে। বুধবার কারামুক্ত হলেও বনানী থানার মামলাসহ অন্য কোনো মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আদালত ও তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি তাঁর জন্য ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় আইনি জটিলতার মধ্যে থাকার পর জামিনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কারাগারের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়েছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো আসামি জামিনে মুক্তি পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না। জামিন মূলত বিচার চলাকালে নির্দিষ্ট শর্তে কারাগারের বাইরে থাকার সুযোগ। মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং অন্যান্য বিচারিক ধাপ পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এগিয়ে যায়।
খায়রুল হকের ক্ষেত্রেও একইভাবে মামলাগুলোর পরবর্তী কার্যক্রম আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলবে। বনানী থানার মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তী জামিন তাঁর তাৎক্ষণিক কারামুক্তি নিশ্চিত করেছে। তবে মামলার অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
২০২৪ সালের ৪ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা বনানী থানার মামলাটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর একটি সময়ের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। সে সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। মহাখালী, শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় আহত ও নিহত ব্যক্তিদের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলা দায়ের করা হয়েছে।
উজ্জ্বল মিয়ার করা মামলাটিও সেই সময়ের একটি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মামলায় হামলা, গুলিবর্ষণ ও ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগের পাশাপাশি হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারায় মামলা করা হয়েছে। তদন্তে এসব অভিযোগের বিষয়ে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় এবং মামলাটি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
খায়রুল হকের মুক্তির খবর প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর পরবর্তী গতিপথ নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তিনি পৃথক আটটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর বনানী থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। সর্বশেষ হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী জামিনের মাধ্যমে সেই মামলাতেও আপাতত কারাগারের বাইরে থাকার সুযোগ পেলেন তিনি।
তবে তাঁর মুক্তিকে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আদালতের জামিন আদেশের পরও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, জামিন এবং কারামুক্তির ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসন নিয়ে জনপরিসরে আগ্রহ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এ ধরনের মামলায় আদালতের স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বুধবার কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে খায়রুল হকের কারাবন্দিত্বের একটি পর্যায়ের অবসান হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর আইনি কার্যক্রম এখনো চলমান। পরবর্তী সময়ে আদালতের আদেশ, তদন্তের অগ্রগতি এবং মামলার বিচারিক কার্যক্রমের ওপরই নির্ভর করবে এই আইনি অধ্যায়ের পরবর্তী গতিপথ।

