প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত তিন মাসে সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি)–এর আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৫৭ কোটি টাকার বেশি ভারতীয় অবৈধ পণ্য ও বিভিন্ন ধরনের মালামাল জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আটজনকে আটক করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
জব্দ করা পণ্যের তালিকায় রয়েছে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মদ, গরু-মহিষ, জিরা, চা পাতা, শাড়ি, কম্বল, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে ১০ হাজারের বেশি ভারতীয় মদ এবং ২ হাজার ২৬০টি গরু-মহিষ জব্দ করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় অবৈধভাবে পণ্য আনা-নেওয়া বন্ধে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টায় সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক। তিনি সীমান্ত পরিস্থিতি, চোরাচালানের নতুন রুট এবং অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে তৈরি হওয়া বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়েও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
বিজিবির অধিনায়ক জানান, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানের রুট পরিবর্তনের পাশাপাশি মব বা সংঘবদ্ধভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবৈধ পাথর উত্তোলনকারী একটি ট্রাক আটকের পর সংঘবদ্ধ একটি দল মব সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে ট্রাক ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান। এ ঘটনায় সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অনেক সময় সংঘবদ্ধ লোকজনকে ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মব তৈরি করে আটক করা অবৈধ পণ্য বা কার্যক্রমকে বৈধ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের জন্য যেমন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের চলাচল ও দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, মব সৃষ্টি করে অবৈধ পণ্য ও কার্যক্রমকে বৈধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হামলার শিকার হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও দুর্ভোগে পড়ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বিজিবির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত তিন মাসের অভিযানের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিজিবি জানায়, সিলেট ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৭ কোটি টাকার বেশি ভারতীয় অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এসব অভিযানে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আটজনকে আটক করা হয়। বিশেষ করে মাদক, গবাদিপশু এবং শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা বিভিন্ন পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের পণ্য চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে। সীমান্তের ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্গম এলাকা এবং একাধিক অনানুষ্ঠানিক চলাচলের পথ থাকায় চোরাকারবারিরা বিভিন্ন সময়ে রুট পরিবর্তন করে পণ্য আনার চেষ্টা করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে রাতের আঁধার, দুর্গম পথ কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার (১৫ আগস্ট) ও রোববার (১৬ আগস্ট) কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ৪৮ বিজিবি। দুই দিনের এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ভারতীয় জিরা, চা পাতা, ফুচকা, শাড়ি, কম্বল, মদ ও বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস সামগ্রী জব্দ করা হয়। বিজিবির হিসাবে এসব পণ্যের আনুমানিক সিজার মূল্য প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
তবে দুই দিনের অভিযানে জব্দ করা পণ্যগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় এসব ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে বিজিবি। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনার সময় চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পণ্য ফেলে পালিয়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের মালিক বা পরিবহনকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজিবির কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু সীমান্তে টহল বা অভিযান চালিয়ে চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতা, স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়। এ কারণে সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সন্দেহজনক চলাচল ও চোরাচালানের সম্ভাব্য রুটগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
সীমান্তে অবৈধ পণ্য প্রবেশের ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। শুল্ক ও কর পরিশোধ না করে পণ্য প্রবেশ করানো হলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি বৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। অন্যদিকে মাদক ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের অবৈধ প্রবেশ জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে ভারতীয় মদসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। গত তিন মাসে ১০ হাজারের বেশি ভারতীয় মদ জব্দ হওয়ার ঘটনা সীমান্তে মাদক চোরাচালানের পরিমাণ সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। একই সময়ে ২ হাজার ২৬০টি গরু-মহিষ জব্দ করা হয়েছে, যা সীমান্ত দিয়ে গবাদিপশু চোরাচালানের বিরুদ্ধেও অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরে।
অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে বিজিবি শুধু বড় চালান আটকের দিকে নয়, চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক শনাক্তের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চোরাচালানের পেছনে থাকা ব্যক্তি, অর্থের উৎস, পরিবহনব্যবস্থা এবং পণ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্তদের শনাক্ত করা গেলে সীমান্তে অবৈধ বাণিজ্যের প্রবাহ আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সীমান্ত এলাকায় মব বা সংঘবদ্ধ বাধার ঘটনা নিয়ে বিজিবির উদ্বেগও বাড়ছে। কোনো অভিযান বা আটকের পর সংঘবদ্ধভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে শুধু অভিযান ব্যাহত হয় না, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ে। সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধের মতো ঘটনা হলে সীমান্ত এলাকার সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগও বিঘ্নিত হতে পারে।
বিজিবির অধিনায়ক জানিয়েছেন, সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য পাচার প্রতিরোধে নিয়মিত আভিযানিক কার্যক্রমের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
জব্দ করা পণ্যের বিষয়ে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে বিজিবি। একই সঙ্গে চোরাচালান বন্ধে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হলে অভিযান আরও কার্যকর হতে পারে।
সিলেটের সীমান্তে গত তিন মাসে ৫৭ কোটি টাকার বেশি পণ্য জব্দের ঘটনা চোরাচালানবিরোধী অভিযানের ব্যাপকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বিপুল পরিমাণ পণ্য জব্দের পাশাপাশি চোরাচালানের মূল নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, মাদক ও অবৈধ পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সংঘবদ্ধ বাধা প্রতিরোধ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত সুরক্ষা ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে তাদের গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।


