প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে জমিজমা লিখে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদ আলী (৭৫) নামে এক বৃদ্ধকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর পুত্রবধূর বিরুদ্ধে। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডটি স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে লাশের গলায় দাগ ও মুখে রক্তের চিহ্ন দেখে সন্দেহ হওয়ায় পুলিশ দাফনের আগেই মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে পুত্রবধূ হত্যার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর এ ঘটনায় পুত্রবধূসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নিহত মোহাম্মদ আলীর পুত্রবধূ ও মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হোসনা বেগম (৩৮), খাইরুল ইসলামের ছেলে রুহুল আমিন (২২) এবং মৃত আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে নজরুল ইসলাম (২০)। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দোয়ারাবাজার উপজেলার ২ নম্বর নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন মোহাম্মদ আলী। তাঁর একমাত্র ছেলে ইসমাইল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। বাড়িতে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে থাকতেন তাঁর পুত্রবধূ হোসনা বেগম ও তাঁদের এক ছেলে। পারিবারিকভাবে জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছিল বলে পুলিশের ভাষ্য।
পুলিশের দাবি, মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে জমিজমা লিখে নেওয়ার জন্য ছেলে ইসমাইল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী হোসনা বেগম চাপ দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বৃদ্ধ এতে রাজি হননি। এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হোসনা বেগম জানিয়েছেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পরিকল্পনায় হোসনা তাঁর আত্মীয় রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে রুহুলের মাধ্যমে সৌদি আরবে থাকা ইসমাইলের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পুলিশের দাবি, বাবাকে হত্যায় সম্মতি দিয়ে ইসমাইল সৌদি আরব থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠান। এরপর রুহুল আমিন আরও কয়েকজনের সঙ্গে মিলে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেন।
গত ১৪ আগস্ট রাত ১২টার দিকে সোনাপুর গ্রামের নিজ বাড়ির শয়নকক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন মোহাম্মদ আলী। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতে রুহুল আমিন, নজরুল ইসলাম ও একই গ্রামের জিয়াউর রহমান ওই বাড়িতে যান। হোসনা বেগম তাঁদের বাড়িতে প্রবেশের সুযোগ করে দেন। পরে তাঁরা একটি মই ব্যবহার করে মোহাম্মদ আলীর কক্ষে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, ওই সময় মোহাম্মদ আলী ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁরা তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করেন। হত্যাকাণ্ডের সময় হোসনা বেগম তাঁদের সহযোগিতা করেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। হোসনা নিজ কক্ষে ফিরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন বলে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছেন।
পরদিন সকালে বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। হোসনা আশপাশের লোকজনকে জানান, তাঁর শ্বশুর ঘরের দরজা খুলছেন না। পরে স্থানীয়রা ঘরে গিয়ে বিছানার ওপর মোহাম্মদ আলীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এর মধ্যে গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি ঘুমের মধ্যেই মারা গেছেন। স্বাভাবিক মৃত্যু ধরে নিয়ে মরদেহ দাফনের প্রস্তুতিও শুরু হয়।
তবে লাশের গলায় দাগ ও মুখে রক্তের চিহ্ন দেখতে পেয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি বিষয়টি দোয়ারাবাজার থানায় জানান। দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, খবর পাওয়ার পর তিনি ফোনে লাশ দাফন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সন্দেহজনক কিছু বিষয় দেখতে পায়।
এরপর পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে পাঠায়। ওই সময় নিহতের পুত্রবধূ হোসনা বেগমও পুলিশের সঙ্গে থানায় যান। পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ওসি তরিকুল ইসলাম তালুকদারের ভাষ্য, হোসনা বেগম জানিয়েছেন, জমিজমা লিখে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর স্বামী ইসমাইল ও তিনি মোহাম্মদ আলীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। পারিবারিক বিরোধের কারণে কিছুদিন ধরে মোহাম্মদ আলী আলাদাভাবে খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। এ বিষয়টিও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়িয়ে দেয় বলে পুলিশের দাবি।
হোসনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ রোববার অভিযান চালিয়ে রুহুল আমিন ও নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ। মামলায় এজাহারভুক্ত আরও কয়েকজন আসামি রয়েছেন এবং তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওসি।
এ ঘটনায় নিহত মোহাম্মদ আলীর নাতনি মোছা. আছমা বেগম (২৬) বাদী হয়ে দোয়ারাবাজার থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, ঘটনার পেছনে মূল কারণ হিসেবে জমিজমা নিয়ে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যেক আসামির ভূমিকা, অর্থের লেনদেন এবং ঘটনার সময় কারা সরাসরি উপস্থিত ছিলেন, সেসব বিষয় তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে থাকা নিহতের ছেলে ইসমাইল হোসেনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
একজন প্রবীণ মানুষকে ঘিরে পারিবারিক সম্পত্তির বিরোধ শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী ঘটনায় রূপ নেওয়ায় এলাকায়ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ থাকলেও সেটি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়াবে, এমন ঘটনা তাঁরা কল্পনাও করেননি। বিশেষ করে স্বাভাবিক মৃত্যুর আড়ালে ঘটনাটি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্র পরিষ্কার করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো আসামি যাতে আইনের আওতার বাইরে না থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ওসি তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, গ্রেপ্তার হোসনা বেগমসহ তিনজন মোহাম্মদ আলীকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর আইনগত সত্যতা নির্ধারিত হবে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নিহত বৃদ্ধের পরিবারের জন্য ঘটনাটি শুধু একজন স্বজনকে হারানোর বেদনা নয়, বরং পারিবারিক সম্পর্ক, সম্পত্তির বিরোধ এবং বিশ্বাসের জায়গায় তৈরি হওয়া গভীর সংকটেরও প্রতিচ্ছবি। তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনাকারী ও জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা স্পষ্ট হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের।


