প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারে মাদকবিরোধী অভিযানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে সদর মডেল থানা পুলিশ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ৮ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, মাদক বিক্রয়লব্ধ বলে দাবি করা নগদ ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের সদস্য এবং সীমান্ত এলাকা থেকে ইয়াবা এনে মৌলভীবাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটের দিকে গোপন সংবাদের মাধ্যমে জানা যায়, ইয়াবার একটি বড় চালান গ্রহণের উদ্দেশ্যে একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকারে কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি মৌলভীবাজার-ঢাকা বাসস্ট্যান্ড এলাকার দিকে আসছেন। তথ্যটি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় মৌলভীবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ।
পরে সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রিপটন পুরকায়স্থের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। অভিযানে সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. রানা মিয়া, এএসআই জাহিদুল ইসলাম, এএসআই ইখতিয়ার হোসেন, কনস্টেবল পিন্টু চন্দ্র শীলসহ অন্যান্য সদস্য অংশ নেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শহরের শ্রীমঙ্গল রোডে পঞ্চমী ওয়াশিং সেন্টারের সামনে অবস্থান নিয়ে সন্দেহভাজন প্রাইভেটকারটির গতিরোধ করে পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাইভেটকারের চালক মুরাদ আলী মিলন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান আরও বিস্তৃত করা হয়। পরে শ্রীমঙ্গল রোডের এসএমএস বাস কাউন্টারের সামনে থেকে তার দুই সহযোগী মানিক আহমদ ও সাব্বির আহমদকে আটক করা হয়।
এরপর উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেহ এবং ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি তল্লাশি করা হয়। তল্লাশির একপর্যায়ে দুটি শপিং ব্যাগের ভেতরে স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো চারটি প্যাকেট পাওয়া যায়। ওই প্যাকেটগুলো খুলে মোট ৮ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি পুলিশ দাবি করেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের হেফাজত থেকে মাদক বিক্রির অর্থ হিসেবে ব্যবহৃত নগদ ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা মেট্রো গ-১৫-৫৬০৫ নম্বরের একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে, যা মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হয়েছে বলে পুলিশের ধারণা।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার মানিক আহমদ (৩২), একই উপজেলার সাব্বির আহমদ (২৬) এবং মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার মুরাদ আলী মিলন (৪৫)। তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পরস্পরের যোগসাজশে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার চালান সংগ্রহ করে মৌলভীবাজার সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশের দাবি। তবে এই বক্তব্য আদালতে যাচাই ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই চূড়ান্তভাবে মূল্যায়িত হবে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, ইয়াবার চালান কোথা থেকে এসেছে, কারা অর্থায়ন করেছে এবং এর পেছনে বড় কোনো মাদক নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে চক্রটির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের প্রবণতা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ইয়াবা পাচারে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। ফলে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি আন্তঃজেলা ও সীমান্তভিত্তিক সমন্বিত নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
মাদকবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইয়াবার মতো মাদক শুধু ব্যক্তি নয়, পরিবার ও সমাজের জন্যও মারাত্মক হুমকি। তরুণদের একটি অংশ দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, যা অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ কারণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবারভিত্তিক নজরদারি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তবে আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত, দোষী নন। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালতের রায়ের মাধ্যমেই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।
মৌলভীবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ জানিয়েছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত ব্যবহার করে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রগুলোকে আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকবে। পুলিশের আশা, নিয়মিত অভিযান, জনসচেতনতা এবং আইনগত কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের প্রচেষ্টা আরও কার্যকর হবে।

