প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় সড়ক পরিবহনের বেপরোয়া গতি, চালকদের চরম ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা এবং যত্রতত্র নিয়ম না মেনে গাড়ি ঘোরানোর আত্মঘাতী সংস্কৃতির বলি হয়েছেন আরও এক উদীয়মান তরুণ। চোখের পলকে একটি সামান্য অসাবধানতা এবং বেপরোয়া ড্রাইভিং কীভাবে একটি তাজা প্রাণকে চিরতরে কেড়ে নিতে পারে, তার এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত দেখতে পেল ফেঞ্চুগঞ্জবাসী। গত বুধবার (৫ আগস্ট) সকালের দিকে ব্যস্ততম ফেঞ্চুগঞ্জ হাসপাতাল রোড এলাকায় সংঘটিত একটি আকস্মিক ও ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় সুবেল আহমদ নামের এক তরুণ মোটরসাইকেল আরোহী ঘটনাস্থলেই নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, ঘটনার দিন সকালে নিহত সুবেল আহমদ তার ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলটি চালিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গতিতে ফেঞ্চুগঞ্জ ফেরিঘাটের নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন। তার চলাচলে কোনো ধরনের ব্যত্যয় বা অতিরিক্ত গতি ছিল না বলেই জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। কিন্তু বিধি বাম, যখন তার মোটরসাইকেলটি ফেঞ্চুগঞ্জ হাসপাতালের মূল প্রবেশপথ সংলগ্ন রোড এলাকার ঠিক সামনে গিয়ে পৌঁছায়, ঠিক সেই মুহূর্তে বিপরীত দিক থেকে অত্যন্ত বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কোনো ধরনের সিগন্যাল বা সতর্কতা না দিয়েই হঠাৎ করে ডান দিকে তীব্র মোড় নিয়ে হাসপাতালের ভেতরের রোডে প্রবেশ করার চেষ্টা চালায়। অটোরিকশা চালকের এই হঠকারী ও হুট করে দিক পরিবর্তনের ফলে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং সোজা গতিতে এগিয়ে আসা মোটরসাইকেলটির সঙ্গে অটোরিকশাটির একটি অত্যন্ত ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে।
সংঘর্ষের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, মোটরসাইকেলচালক সুবেল আহমদ মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার বাহনসহ ছিটকে সরাসরি রাস্তার ঠিক পাশের একটি ভারী কংক্রিটের বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে সজোরে গিয়ে আছড়ে পড়েন। মাথার সংবেদনশীল অংশে এবং শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অত্যন্ত মারাত্মক আঘাত পাওয়ার কারণে তিনি ঘটনাস্থলেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন এবং মুহূর্তের মধ্যে তার করুণ মৃত্যু ঘটে। ঘটনার আকস্মিকতায় আশপাশের পথচারী ও স্থানীয় দোকানদাররা প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত দৌড়ে এসে দেখেন যে তরুণ সুবেল রাস্তার ওপর রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে আছেন। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে স্থানীয় জনতা ভিড় জমায় এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্বজনরা। খবর পেয়ে দ্রুত ফেঞ্চুগঞ্জ থানা পুলিশ ও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে।
এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহত সুবেল আহমদের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। একমাত্র উপার্জনক্ষম বা আদরের সন্তানকে এভাবে হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে তার পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের আকাশ-বাতাস। স্থানীয় এলাকাবাসী ও বিশিষ্টজনেরা এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর জন্য প্রধানত দায়ী করেছেন যত্রতত্র ট্রাফিক আইন অমান্যকারী অটোরিকশা চালকদের বেপরোয়া ও অপরিকল্পিত গাড়ি চালানোর মানসিকতাকে। দিনের পর দিন ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন অলিগলি ও মূল সড়কে লাইসেন্সবিহীন এবং অদক্ষ চালকদের দ্বারা সিএনজি অটোরিকশা পরিচালনার কারণে প্রতিনিয়ত এ ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে বলে অভিযোগ করেন ক্ষুব্ধ জনতা।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, ফেঞ্চুগঞ্জের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মোড় এবং হাসপাতাল রোড সংলগ্ন এলাকাগুলোতে প্রায়ই সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোর এ ধরনের আকস্মিক মোড় নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কোনো ধরনের ইন্ডিকেটর বা হাতের ইশারা ছাড়াই হঠাৎ করে ডানে বা বামে মোড় নেওয়ার কারণে পেছন বা বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল বা রিকশা চালকরা মুহূর্তের মধ্যে বিপদে পড়েন এবং এ ধরনের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ট্রাফিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির অভাব এবং চালকদের মধ্যে ন্যূনতম ট্রাফিক জ্ঞান না থাকার কারণেই আজ অকালেই ঝরে গেল একটি তাজা প্রাণ। সুবেলের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর স্থানীয় যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষ ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার প্রতিটি সড়কে স্পিডব্রেকার বা গতিরোধক স্থাপন, অবৈধ অটোরিকশার চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবিতে তীব্র আওয়াজ তুলেছেন।
পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই ঘাতক সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করার চেষ্টা চালানো হয়েছে এবং এর চালককে আইনের আওতায় আনার জন্য নিবিড় অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং এই ঘটনায় একটি নিয়মিত অপমৃত্যু মামলা কিংবা সড়ক পরিবহন আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জের এই হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, সামান্য একটু অসতর্কতা এবং সড়কের নিয়মের অবহেলা কীভাবে একটি সুন্দর জীবনকে মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারে ঢেকে দিতে পারে। সুবেলের এই অকাল প্রয়াণ যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না করে, তার জন্য প্রশাসন ও চালকসহ সকলের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের সময় এখনই।


