প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, মারধর, ভাঙচুর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলা দায়েরকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। জেলা ছাত্রদলের এক নেতার দায়ের করা এ মামলায় এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ দলটির ১০ জন নেতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) রাত প্রায় ১০টার দিকে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলার এজাহার জমা দেন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন রুকন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ২৮ জুলাই বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে হবিগঞ্জ পৌর এলাকার কোর্ট মসজিদের সামনে এনসিপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই সংঘর্ষে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে বলে বাদী অভিযোগ করেছেন।
এজাহারে বাদী দাবি করেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে জুলাই আন্দোলনের শহীদ রিপন শীলের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং পরবর্তী শোকসভায় অংশ নিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কোর্ট মসজিদের সামনে জড়ো হন। এ সময় এনসিপির নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে তাঁদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মামলায় নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, সারজিস আলম, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মাহবুবুল বারী চৌধুরীসহ মোট ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার সময় লোহার রড, রামদা, ফিকল, ইটের টুকরোসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এতে জেলা ছাত্রদল নেতা মাহফুজ চৌধুরী, মোজাক্কির হোসেন ইমনসহ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় শুধু হামলার অভিযোগই নয়, ছিনতাইয়ের অভিযোগও আনা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, সংঘর্ষ চলাকালে বাদী মো. ইকবাল হোসেন রুকনের ব্যবহৃত আইফোন-১৩, ছাত্রদল নেতা মোজাক্কির হোসেন ইমনের আইফোন-১১, মাহফুজ চৌধুরীর আইফোন-১৪, মাহমুদুল হাসান গাজীর স্যামসাং এস-২২ মোবাইল ফোন, রক্সি ইসলামের কাছে থাকা নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং শিমুল হাসানের আইফোন-১৫ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর অভিযুক্তরা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন।
ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন এলাকায় দুই পক্ষের অবস্থানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। তবে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ এবং কোন পক্ষ থেকে প্রথমে হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে পুরো বিষয়টি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
হবিগঞ্জের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জেলায় উত্তেজনার ঘটনা বেড়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক পরিবেশে স্বাভাবিক হলেও তা সংঘর্ষ, সহিংসতা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছানো উদ্বেগের বিষয়। তারা মনে করেন, এমন ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
এদিকে মামলায় যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে এখনো প্রমাণিত হয়নি। মামলার এজাহারে উত্থাপিত অভিযোগগুলো বাদীপক্ষের দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে এনসিপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংবাদে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
হবিগঞ্জ সদর মডেল থানা সূত্রে জানা গেছে, এজাহার গ্রহণের পর মামলাটি আইনানুগ প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে ঘটনাস্থলের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং সংঘর্ষের ভিডিও ফুটেজ বা অন্যান্য আলামত যাচাই করা হতে পারে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আইনজীবীদের মতে, হত্যাচেষ্টা, মারধর, ভাঙচুর ও ছিনতাইয়ের মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ধারার বিধান অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, ঘটনাটি কেন্দ্র করে যেন নতুন করে কোনো সহিংসতা বা উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়। তারা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
হবিগঞ্জের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার পরবর্তী অগ্রগতি এখন নির্ভর করছে তদন্তের ফলাফল, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং আদালতের আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


