প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা নতুন গণতান্ত্রিক ধারায় রাষ্ট্রের নানামুখী সংস্কারের প্রক্রিয়া যখন এগিয়ে চলেছে, ঠিক তখনই অর্থনীতি ও জনজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে সামনে এসেছে জ্বালানি খাতের ভঙ্গুর দশা। গত প্রায় দুই দশক ধরে চলা নীতিনৈতিকতাহীন অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা আজ সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, যদি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা এবং জনগণের প্রতি নিখাদ দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যায়, তবে এই ক্রান্তিকাল পেরিয়ে বাংলাদেশকে একটি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। সিলেটের মাটি ও মানুষের আবেগঘন পরিবেশে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি জ্বালানি খাতের এই নির্মম বাস্তবচিত্র তুলে ধরেন।
বুধবার দুপুরে সিলেট জেলা প্রশাসন শিল্পকলা একাডেমির অডিটোরিয়ামে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভা, শহীদ পরিবারবর্গ ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস স্মরণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই আড়ম্বরপূর্ণ ও আবেগঘন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যেখানে একদিকে যেমন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের স্মৃতিচারণা হয়, অন্যদিকে তেমনি উঠে আসে নতুন স্বাধীন বাংলাদেশে আহত যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের বেঁচে থাকার আকুতি ও বর্তমান প্রশাসনিক নানা জটিলতার কথা।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাজুড়ে ছিল দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট। এই সংকট প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বিগত সরকারের আমলের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান যে, বর্তমান বাংলাদেশ আমদানীকৃত গ্যাসের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আর জ্বালানি খাতের এই শোচনীয় অবস্থার জন্য সরাসরি দায়ী বিগত ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা নীতিনির্ধারকদের চরম অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও হঠকারী সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটানো, কলকারখানায় উৎপাদন সচল রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি রাতারাতি সম্ভব নয়। এর জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। এই রূপান্তরকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কিছুটা ব্যাহত হতে পারে এবং নিত্যদিনের ভোগান্তি বাড়তেও পারে, তবে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের স্বার্থে এই সাময়িক কষ্ট সহ্য করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের টেকসই সমাধান না করে সাময়িক লোকরঞ্জনমূলক নীতি গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।
উন্নয়ন কেবল কিছু ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের নাম নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক ও সম্মিলিত প্রয়াস উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণ সমাজ যে অভূতপূর্ব রক্তক্ষয়ী ভূমিকা পালন করেছে, সেই তারুণ্যের অপ্রতিরোধ্য শক্তিকে কোনোভাবেই বিনষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। তারুণ্যের এই তেজ ও সামাজিক শক্তিকে আগামী দিনে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাবে রাষ্ট্র। ফ্যাসিবাদের শেকড় উপড়ে ফেলতে তরুণরা যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা সামাজিক অবমূল্যায়নের শিকার না হয়, সে বিষয়েও তিনি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন।
তবে মন্ত্রীর এই আশাবাদী বক্তব্যের বিপরীতে অনুষ্ঠানে উপস্থিত জুলাই যোদ্ধারা তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বঞ্চনার করুণ চিত্র তুলে ধরেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেক জুলাই যোদ্ধা অভিযোগ করেন যে, স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে বুক চিতিয়ে লড়াই করলেও আজ তাদের বিভিন্ন সরকারি ও আধাসরকারি দপ্তরে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম অসম্মান ও অবমূল্যায়নের শিকার হতে হচ্ছে। সরকারের নানামুখী কল্যাণমূলক উদ্যোগের সুফল পেতে তাদের নানা দপ্তরে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
পর্যাপ্ত সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়ে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জুলাইযোদ্ধা লিটন আহমদ। তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করতে, রক্ত ঝরাতে বা আর্থিক কোনো ভাতা কিংবা বিশেষ সুবিধার লোভে নিজের জীবন বাজি রেখে সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনে অংশ নেননি। দেশের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনাই ছিল তাদের একমাত্র ব্রত। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধারা সমাজের নানা প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও দুষ্কৃতকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি ও নানা ধরনের হেনস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যদি এই সরকারি গেজেট বা স্বীকৃতি জুলাই যোদ্ধাদের জন্য জীবনের ঝুঁকি ও হুমকির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে এমন সম্মানজনক গেজেট কিংবা স্বীকৃতি অবিলম্বে কেড়ে নেওয়া হোক, তবুও তারা যেন সম্মানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে পারেন।
এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সংঘটিত বিভিন্ন মামলার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মন্থরগতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন আন্দোলনকারী যোদ্ধারা। লিটন আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের অনেক তদন্ত কর্মকর্তা এখনো জুলাই যোদ্ধাদের কাছে আন্দোলন বা সংঘাতের সময়কার ঘটনার মূল ভিডিও ফুটেজ বা ডিজিটাল প্রমাণ চেয়ে নানামুখী চাপ সৃষ্টি করেন। অথচ সেই দিনগুলোতে কেউ ক্যামেরা বা ফুটেজ সংগ্রহের জন্য রাজপথে জীবন বাজি রেখে স্বৈরাচারের বুলেটিয় গুলোর সামনে বুক পেতে দাঁড়াননি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম উপহাসের শামিল বলে মনে করেন তারা।
অন্যদিকে, পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে এক শোকাবহ ও হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয় যখন শহীদ পরিবারের সদস্যরা একে একে মঞ্চে এসে তাদের হারানো স্বজনদের স্মৃতিচারণা করতে শুরু করেন। শহীদ পাভেলের বাবা তার আদরের সন্তানকে হারানোর গভীর বেদনা প্রকাশ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং উপস্থিত সকলের কাছে তার শহিদ সন্তানের আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া কামনা করেন। তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান যেন শুধু দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিতভাবে শহীদ পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেওয়া হয়। পাশাপাশি তিনি বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ৭ জন বীর শহীদের কবর জিয়ারত করার বিনীত অনুরোধ জানান, যা উপস্থিত সকলের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে।
অনুষ্ঠানে শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের ভাই জাবুর আহমদ তার বক্তব্যে তৎকালীন উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯ জুলাই সিলেটের কালেক্টরেট মসজিদের সামনে থেকে যখন ফ্যাসিবাদবিরোধী একটি ঐতিহাসিক মিছিল বের হয়েছিল, সেই সাহসিকতাপূর্ণ মিছিলে সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। শহীদ তুরাবের মরদেহ হাসপাতালে নেওয়া এবং পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া নানা অপ্রীতিকর ঘটনার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের রক্তঝরা দিনগুলোর প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী এই সিলেট এবং এখানকার আপামর জনসাধারণ।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত এই রাজনৈতিক বিজয়কে টিকিয়ে রাখতে হলে জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে যেকোনো মূল্যে ঐক্য বজায় রাখতে হবে। কোনো ষড়যন্ত্রকারী যেন এই ঐক্যে ফাটল ধরাতে না পারে সে বিষয়ে সকলকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তারা। একটি বৈষম্যহীন, কল্যাণমুখী ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের মহান ব্রতে দলমত নির্বিশেষে সকলকে সরকারের পাশে থেকে সার্বিক সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়।
সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম এ মালিক তার বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক ভূখণ্ড সুরক্ষায় জুলাই আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, যদি জুলাইয়ের এই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত না হতো, তবে এই সার্বভৌম বাংলাদেশ হয়তো চিরতরে একটি পরাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারত। তিনি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তার বিচক্ষণ নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে উৎখাত করা সম্ভব হয়েছে। জুলাইয়ের গণআন্দোলনের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্রকারীরা অতীতে বহুবার পুতুল সরকার তৈরির অপচেষ্টা চালিয়ে এই জাতির মান-মর্যাদা ধূলিসাৎ করার চেষ্টা করেছিল। জুলাই যোদ্ধারা আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ও গর্বিত বন্ধু। কোনো অবস্থাতেই যেন তাদের অবমূল্যায়ন করা না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের সকল স্তরকে কঠোর বার্তা দেওয়া প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে সিলেটের ১৪ জন শহীদ পরিবারের হাতে বিশেষ সংবর্ধনা স্মারক ও আর্থিক অনুদান তুলে দেওয়া হয়। শহীদ পরিবারের সদস্যদের চোখের জল আর জুলাই যোদ্ধাদের না পাওয়ার বেদনা মিলিয়ে এক অন্যরকম আবেগী পরিবেশের মধ্য দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘটে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সংবর্ধনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীমসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা। পরিশেষে সভার সভাপতি জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সমাপনী বক্তব্য ও জুলাই শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।


