প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ভারতীয় অবৈধ চোরাচালানি পণ্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। শুক্রবার ও শনিবার সিলেট-৪৮ বিজিবি এবং জকিগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (১৯ বিজিবি) আওতাধীন বিভিন্ন সীমান্ত ফাঁড়ির সদস্যরা এসব অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে ভারতীয় মদ, কসমেটিকস, খাদ্যপণ্য, পোশাক, গবাদিপশু, বিড়ি, সুপারি, জিরাসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচারের সময় কয়েক ধরনের দেশীয় পণ্য ও পাথর বহনকারী ঠেলাগাড়িও আটক করা হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিজিবির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধ এবং অবৈধ পণ্য পরিবহন বন্ধে গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে এসব অভিযান পরিচালিত হয়। পৃথক অভিযানগুলোতে জব্দ করা পণ্যের মোট মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, সিলেট-৪৮ বিজিবির আওতাধীন বাংলাবাজার, উৎমা, বিছনাকান্দি, লাফার্জ, কালাইরাগ, প্রতাপপুর, সংগ্রাম, দমদমিয়া ও তামাবিল সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় মদ, বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস, মাল্টা, কম্বল, মহিষ, চকলেট, গরু, জুস, বিস্কুট, বিড়ি, সুপারি, বাসমতি চাল, সনপাপড়ি ও জিরা।
এসব পণ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচারের প্রস্তুতিকালে শিং মাছ, রসুন, সোয়েটার এবং পাথর বহনকারী বাংলাদেশি ঠেলাগাড়িও আটক করা হয়েছে। সীমান্তের দুই পাশেই অবৈধ পণ্য পরিবহনের তৎপরতা রয়েছে বলে এসব জব্দের ঘটনা থেকে ধারণা পাওয়া যায়। তবে পণ্যগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চোরাচালান চক্রের সদস্যদের বিষয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
অন্যদিকে জকিগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (১৯ বিজিবি) অধীনস্থ সুরাইঘাট ও ডোনা সীমান্ত ফাঁড়ির টহলদল কানাইঘাট উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের চোরাচালানি পণ্য জব্দ করেছে। এসব অভিযানের মধ্যে সুরাইঘাট বিওপির অভিযান ছিল উল্লেখযোগ্য।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সুরাইঘাট বিওপির একটি টহলদল সিংগারখাল এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় ভারত থেকে অবৈধভাবে আনা ১৫৫ পিস শাড়ি, ৩ হাজার ৩৬০ প্যাকেট পাতার বিড়ি এবং ৬৪ পিস নিভিয়া লোশন জব্দ করা হয়। জব্দ করা এসব পণ্যের আনুমানিক সিজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৩ হাজার ৮০০ টাকা।
এর আগে ৩০ অক্টোবর সোনাতনপুঞ্জি এলাকায় অভিযান চালায় সুরাইঘাট বিওপির সদস্যরা। ওই অভিযানে ৩৬০ কেজি ভারতীয় জিরা এবং ৭০ কেজি চা-পাতা জব্দ করা হয়। এসব পণ্যের সিজারমূল্য ৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বলে জানিয়েছে বিজিবি। সীমান্তবর্তী এলাকায় খাদ্যপণ্য ও নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী অবৈধভাবে প্রবেশের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের অভিযান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ডোনা বিওপির সদস্যরাও পৃথক অভিযান পরিচালনা করেন। শনিবার মিকিরপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪ হাজার পিস ভারতীয় সুপারি জব্দ করা হয়। এসব সুপারির আনুমানিক সিজারমূল্য ২৪ হাজার টাকা। সীমান্তবর্তী এলাকায় ছোট ও বড় চালানের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের চেষ্টা বন্ধে বিজিবির নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
সব মিলিয়ে সিলেট-৪৮ বিজিবি এবং ১৯ বিজিবির আওতাধীন এলাকাগুলোতে পরিচালিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ পণ্য জব্দ হয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী, পোশাক, মদ, বিড়ি ও গবাদিপশুর মতো বিভিন্ন পণ্য উদ্ধার হওয়ায় সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানের বিস্তৃত ধরন আবারও সামনে এসেছে। এসব পণ্য কীভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা করছিল, তা খতিয়ে দেখা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো ভৌগোলিকভাবে বেশ বৈচিত্র্যময়। কোথাও পাহাড়ি অঞ্চল, কোথাও নদী, আবার কোথাও জনবসতি ও চা-বাগানসংলগ্ন সীমান্ত রয়েছে। এসব এলাকায় দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে নজরদারি বজায় রাখা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় দায়িত্ব। সীমান্তের বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে অবৈধভাবে পণ্য আনা-নেওয়ার চেষ্টা হলে তা শনাক্ত করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি প্রয়োজন হয়।
চোরাচালান শুধু শুল্ক ফাঁকির বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজস্ব আদায় এবং বাজারব্যবস্থারও সম্পর্ক রয়েছে। অবৈধভাবে আমদানি করা পণ্য বাজারে প্রবেশ করলে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারীরা প্রতিযোগিতায় সমস্যায় পড়তে পারেন। একই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত শুল্ক ও কর আদায় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে মদ, বিড়ি ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত পণ্যের অবৈধ প্রবেশ জনস্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য ভারতে পাচারের চেষ্টা দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা এবং বৈধ রপ্তানি কার্যক্রমের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কোনো পণ্য বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সীমান্ত অতিক্রম করলে তার উৎপাদন, পরিবহন ও বাণিজ্যিক লেনদেনের ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের প্রকৃত বাজারমূল্য ও বাণিজ্যিক প্রবাহ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজিবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চোরাচালান এবং মাদকদ্রব্য পাচার প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় সন্দেহজনক চলাচল ও অবৈধ পণ্য পরিবহনের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জব্দ করা পণ্যগুলো কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
তবে শুধু পণ্য জব্দের মধ্যেই সীমান্ত নিরাপত্তা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলে চোরাচালানের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা কঠিন। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, পরিবহনকারী এবং পেছনে থাকা সংগঠিত চক্র শনাক্ত করাও জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষকে চোরাচালানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত তৎপরতা একসঙ্গে কাজ করলে অবৈধ পণ্য পরিবহনের সুযোগ কমানো সম্ভব।
সিলেটের বিভিন্ন সীমান্তে একাধিক অভিযানে প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার পণ্য জব্দের ঘটনা সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নজরদারির গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এখন জব্দ করা পণ্যের আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পাশাপাশি এসব চালানের উৎস, পরিবহনপথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তে নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং বৈধ বাণিজ্য নিশ্চিত করতে বিজিবি, কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকাই প্রত্যাশিত।


