প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশে হামের সংক্রমণ ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে হামের উপসর্গ দেখা গেছে এমন ১ হাজার ৩১৬ শিশুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে ৭৫ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে এক দিনে নতুন করে উপসর্গযুক্ত ও নিশ্চিত হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৯১।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ২৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছে ১০৫ শিশু। অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১ হাজার ১৪৬ শিশু। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর বড় অংশই ঘটেছে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন বা পর্যবেক্ষণে থাকা শিশুদের মধ্যে।
শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো হাম ও ডেঙ্গুবিষয়ক পৃথক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত নিয়মিত তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হাম পরিস্থিতির অবনতি ও শিশু মৃত্যুর খবর উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৬৭৩। একই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ৭৭০ জন। এই দুই শ্রেণির হিসাব মিলিয়ে মোট আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৫১ হাজার ৪৪৩।
এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৬৩৯ শিশু। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৯৯ শিশু। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে এবং তাদের একটি বড় অংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর খবর পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিকটি সামনে আনছে।
গত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যানেও রোগীর চাপের চিত্র স্পষ্ট। এক দিনে ১ হাজার ৩১৬ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এবং ৭৫ শিশুর হাম নিশ্চিত হয়েছে। নতুন রোগীর সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় কতটা বেড়েছে বা কমেছে, তা নির্ধারণে ধারাবাহিক কয়েক দিনের তথ্য তুলনা করা প্রয়োজন। তবে প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া দুই শিশুর একজন সিলেট বিভাগের এবং অন্যজন খুলনা বিভাগের। তবে বিজ্ঞপ্তিতে শিশুদের বয়স, পরিচয়, নির্দিষ্ট জেলা কিংবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে, একই সময়ে বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। সেখানে নতুন করে ৪৯৭ শিশুর মধ্যে উপসর্গ দেখা গেছে। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে ৩৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। ফলে নতুন রোগীর চাপের দিক থেকে রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
এর আগের দিনও দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে বাসস জানায়, ২৪ ঘণ্টায় সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তখন ১৫ মার্চ থেকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৪৯, যার মধ্যে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ১০৫ এবং উপসর্গজনিত মৃত্যু ১ হাজার ১৪৪। পরদিনের হিসাবে উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ১৪৬ হয়েছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়ানো ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে অন্য ব্যক্তিও সংক্রমিত হতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যাঁদের শরীরে হাম প্রতিরোধী ক্ষমতা নেই, তাঁদের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ সংক্রমিত হতে পারেন। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সাধারণত উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেওয়া হামের পরিচিত লক্ষণ। তবে সব জ্বর বা র্যাশই হাম নয়। তাই উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়া রোগ নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হামের জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, কানের সংক্রমণ এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো গুরুতর সমস্যা থাকতে পারে। এসব জটিলতা শিশুর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এ কারণেই শিশুদের ক্ষেত্রে হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। >
হাম প্রতিরোধে টিকাদানকে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, হামযুক্ত টিকার দুটি ডোজ সংক্রমণ এবং রোগের গুরুতর জটিলতা থেকে প্রায় ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা দিতে পারে। যেসব শিশুর নিয়মিত টিকার ডোজ বাদ পড়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী করণীয় জানতে স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
দেশে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ২৫১ ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। আক্রান্ত শিশুর পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্য এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুই লাখের বেশি শিশু। তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার শিশু সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান একদিকে বিপুলসংখ্যক শিশুর চিকিৎসা নেওয়ার চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে প্রতিদিন নতুন রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
শিশুদের জীবন রক্ষায় এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সংক্রমণ প্রতিরোধ, টিকাদানের আওতা বাড়ানো এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত তথ্য প্রকাশ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগের বিস্তার সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

