তাহসিফ হত্যা: বন্ধু দীপের চার দিনের রিমান্ড

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি হত্যার ঘটনায় তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। রাজধানীর উত্তরখান থানায় দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিওয়াসের আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

তাহসিফের মৃত্যুকে ঘিরে পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে গভীর শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া, পরদিন তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার, বন্ধুর সঙ্গে শেষবার দেখা হওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ এবং পরে ওই বন্ধুকে হেফাজতে নেওয়ার ঘটনাগুলো তদন্তকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে মামলার তদন্ত এখনো চলমান। দীপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কিংবা তাঁর দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা আদালতে বা তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাই ঘটনার প্রতিটি দিক যাচাই করে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করাই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. ফিরোজ উদ্দিন আদালতে দীপকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন, ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং প্রয়োজনীয় আলামত উদ্ধারের জন্য আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তদন্তের স্বার্থে দীপের কাছ থেকে ঘটনার আগে ও পরের কর্মকাণ্ড, তাহসিফের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং তাঁদের চলাচলের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার প্রয়োজন রয়েছে বলেও পুলিশের আবেদনে বলা হয়।

শনিবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে দীপকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার সাত দিনের রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি তদন্তের অগ্রগতি এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকার সম্ভাবনা বিবেচনায় আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মুতাসিম বিল্লাহ রিমান্ডের মেয়াদ কমিয়ে দুই দিন করার আবেদন জানান। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ফলে পুলিশের চাওয়া সাত দিনের পরিবর্তে চার দিন তাঁকে হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পাচ্ছে তদন্তকারী সংস্থা।

এর আগে শনিবার সকালে নিহত তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বাদী হয়ে উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা জানতে এবং জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতেই তিনি আইনের আশ্রয় নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মামলাটি দায়েরের পর আগে থেকে হেফাজতে থাকা দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন ২৭ বছর বয়সী তাহসিফ। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, তাঁর জুনিয়র বন্ধু দীপের ডাকে সাড়া দিয়েই তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে সিসিটিভি ফুটেজে তাঁদের দুজনকে একসঙ্গে দেখা যায়। ফুটেজে তাঁদের হাত মেলানোর পর আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে করে ভিন্নভাবে গন্তব্যের দিকে রওনা হতে দেখা গেছে বলে জানা গেছে।

তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্বজনদের কাছে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য না থাকায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পায় টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি। পুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরে মরদেহের পকেটে থাকা আইফোন এবং হাতে থাকা ঘড়ির সূত্র ধরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। সেটি নিখোঁজ তাহসিফের মরদেহ বলে নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে।

মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। নদীতে কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো, তিনি কী পরিস্থিতিতে সেখানে পৌঁছেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে নিখোঁজ হওয়ার আগে দীপের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার তথ্য তদন্তে গুরুত্ব পায়। তবে শুধু একসঙ্গে দেখা যাওয়া বা পরিচিতজন হওয়ার কারণে কারও অপরাধে জড়িত থাকা প্রমাণিত হয় না। এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় গত ২৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরদিন শুক্রবার তাঁকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের একটি সুজুকি জিক্সার ১৫০ সিসি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটি কীভাবে সেখানে পৌঁছাল এবং এর সঙ্গে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

পিবিআইয়ের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করলে তাহসিফ আতঙ্কিত হয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন বলে তাঁর বক্তব্য। দীপের দাবি অনুযায়ী, ওই পরিস্থিতিতে তিনি নিজেও নিরাপত্তার জন্য আড়ালে চলে যান। তবে তাঁর দেওয়া এই বর্ণনার সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ঘটনার সময় সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন, ধাওয়ার ঘটনা আদৌ ঘটেছিল কি না এবং তাহসিফ কীভাবে নদীতে পড়লেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের কাছে দীপের বক্তব্যের বিভিন্ন দিক যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর বর্ণনার সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার করা মোটরসাইকেল, ঘটনাস্থলের আলামত এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্তের মিল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও অন্যান্য ফরেনসিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা মামলার গতিপথ নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

এ ঘটনায় তাহসিফের পরিবারের জন্য সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো প্রিয়জনকে হারানোর শোকের পাশাপাশি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা। একজন তরুণের নিখোঁজ হওয়া এবং পরদিন নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই পরিবারকে গভীর মানসিক সংকটের মধ্যে ফেলেছে। এখন তাঁরা চান, তদন্ত যেন কোনো চাপ বা পক্ষপাত ছাড়াই পরিচালিত হয় এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়।

চার দিনের রিমান্ডে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে রিমান্ডে নেওয়া মানেই কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। আইন অনুযায়ী তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত করা, উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের মালিকানা ও ব্যবহার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং ঘটনার আগে-পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটনে এখন তদন্তের প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্বজন ও সচেতন মহল। তাঁদের প্রত্যাশা, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও প্রযুক্তিগত আলামত মিলিয়ে পুলিশ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আনবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, আবার প্রকৃত অপরাধীও যেন আইনের বাইরে থেকে যেতে না পারেন—এ নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাই এই মামলার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মধ্য দিয়েই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের পরিচয় প্রকাশ পাবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ইতালিতে ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘট, রাজপথে হাজারো মানুষ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার জামায়াত আমিরের

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাল্লায় বাড়িঘর ভাঙচুর, ৩৫ লাখ টাকার লুটের অভিযোগ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য জব্দ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে এইচএসসিতে পাঁচ বছর ধরে পাসের হারে এগিয়ে মেয়েরা

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

ইতালিতে ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘট, রাজপথে হাজারো মানুষ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার জামায়াত আমিরের

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাল্লায় বাড়িঘর ভাঙচুর, ৩৫ লাখ টাকার লুটের অভিযোগ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য জব্দ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে এইচএসসিতে পাঁচ বছর ধরে পাসের হারে এগিয়ে মেয়েরা

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট বোর্ডে এইচএসসির ফল বিপর্যয়, পাসের হার ৫০.৯০%

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হাম ও উপসর্গে শিশুমৃত্যু ১ হাজার ২৫১ ছাড়াল

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ