প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় রাতের আঁধারে একটি পরিবারের বসতঘর ও দোকানসহ তিনটি ঘর ভাঙচুর এবং প্রায় ৩৫ লাখ টাকার মালামাল লুটের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার ১ নম্বর আটগাঁও ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে গত ২৯ অক্টোবর রাতে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ একদল ব্যক্তি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি ও দোকানের মালামাল তছনছ করে, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, গবাদিপশু ও মূল্যবান আসবাবপত্র নিয়ে যায়। এ সময় পরিবারের নারী সদস্যদের মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার পর থেকে পরিবারটি আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একদিকে বসতঘর ও দোকানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ—সব মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে তাঁদের। জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবহৃত দোকান ও বসবাসের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগী ফরিদা আক্তার উজ্জ্বলার ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে এক থেকে দেড় শ লোক তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায়। তিনি জানান, হামলাকারীরা প্রথমেই বাড়ির বৈদ্যুতিক বাতি ভেঙে ফেলে। এরপর বসতঘর ও দোকানঘরসহ তিনটি ঘরে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। আকস্মিক এ হামলায় পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আগেই ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ভেঙে ফেলা হয় এবং মালামাল নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
উজ্জ্বলা দাবি করেন, হামলার সময় তাঁকে এবং তাঁর অন্তঃসত্ত্বা ভাবিকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়েছে। ঘরে থাকা প্রায় আড়াই থেকে তিন ভরি স্বর্ণালংকার, কয়েকটি গরু, দোকানের মালামাল, ফ্রিজ, এলইডি টেলিভিশন ও আসবাবপত্র লুট করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর হিসাবে, ভাঙচুর ও লুটপাট মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। তবে ক্ষয়ক্ষতি ও লুট হওয়া সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় হিসাব যাচাই করা জরুরি।
ঘটনার পর বাড়ির যে চিত্র দেখা গেছে, তা একটি পরিবারের ওপর সংঘটিত সহিংসতার ভয়াবহতা তুলে ধরে। ভুক্তভোগীর দাবি, দোকানঘরসহ তিনটি ঘর এমনভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে যে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। শৌচাগারও ভাঙচুরের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। ঘরের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। কোথাও ভাঙা জিনিসপত্র, কোথাও ধ্বংসস্তূপ—সব মিলিয়ে একসময়কার বসতবাড়িটি এখন বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে।
একটি পরিবারের কাছে বসতঘর শুধু থাকার জায়গা নয়; সেখানে জমে থাকে দীর্ঘদিনের স্মৃতি, প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। একইভাবে ছোট দোকান অনেক পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। সেই ঘর ও দোকান একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবারটির ওপর আর্থিক চাপ বহুগুণে বেড়ে যায়। বিশেষ করে নারী ও অন্তঃসত্ত্বা সদস্যদের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ উঠলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। তাই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উজ্জ্বলা তাঁর পরিবারের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর ফুফু জমিলা বেগম একজন বীরাঙ্গনা, দাদা মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন এবং তাঁর বাবা যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী ছিলেন। এমন একটি পরিবারের সদস্য হয়েও তাঁকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন এই নারী। তবে পরিবারের মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি সরকারি নথি বা সংশ্লিষ্ট মামলার দলিলের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনার পেছনে পূর্ববিরোধ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। তাঁর ভাষ্য, গত ২৩ অক্টোবর তাঁদের দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ জানানোর পর পুলিশ তদন্তের জন্য গ্রামে আসে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার পরই হামলার ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ তদন্তে আসাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেই বিরোধের জেরেই তাঁদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।
উজ্জ্বলা স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাঁদের নেতৃত্বে হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে জালাল মিয়া, হেকিম মিয়া, আজিজুল মিয়া ও শাহীন রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে কারও বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্তই প্রকৃত ঘটনা সামনে আনতে পারে।
অন্যদিকে, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক জালাল মিয়া এবং শাল্লা উপজেলা মাদকবিরোধী কমিটির নেতৃবৃন্দ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, এলাকায় মাদকবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারের কেউ কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত। তবে তাঁরা রাতের আঁধারে বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্যের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও তা আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তদন্ত ও নিষ্পত্তি করতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন না।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তাঁর বক্তব্য, কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কারও বাড়িঘর ভাঙচুর করার অধিকার কারও নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা ও লুট হওয়া সম্পদের বিবরণে কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। কোথাও পরিবারের পক্ষ থেকে অন্তত পাঁচজন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, আবার কোথাও তিন নারী ও এক শিশুর চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য এসেছে। একইভাবে লুট হওয়া গবাদিপশু, ফ্রিজ, নগদ অর্থ ও অন্যান্য সম্পদের হিসাবেও ভিন্ন বিবরণ পাওয়া গেছে। ফলে এসব তথ্য চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে পুলিশি তদন্ত, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং পরিবারের দেওয়া সম্পদের তালিকা যাচাই করা জরুরি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি কী পরিমাণ সম্পদ লুট হয়েছে, তারও সঠিক হিসাব নির্ধারণ করতে হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, গ্রামাঞ্চলে বিরোধ বা অপরাধের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কোনো পরিবারের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা পুলিশকে জানাতে হবে এবং প্রচলিত আইনের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধের নামে কারও বাড়িঘরে হামলা, নারী ও শিশুকে মারধর কিংবা সম্পদ নষ্ট করার ঘটনা ঘটলে তা আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
দৌলতপুরের এ ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা, আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বক্তব্য গ্রহণ এবং সব পক্ষের তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। একটি পরিবার যেন ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই ন্যায়বিচার চাইতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং দোষী যে-ই হোক, তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


