সিলেটে এইচএসসিতে পাঁচ বছর ধরে পাসের হারে এগিয়ে মেয়েরা

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে টানা পাঁচ বছর ধরে পাসের হারে ছেলেদের পেছনে ফেলছে মেয়েরা। চলতি বছরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে তারা। সামগ্রিক ফলাফলে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমে গেলেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সাফল্যের হার বেশি। তবে পাসের হারে এগিয়ে থাকলেও সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রে এবার মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা সামান্য এগিয়ে রয়েছে। ফলে এবারের ফলাফলে দুই ধরনের চিত্র সামনে এসেছে। একদিকে মেয়েদের ধারাবাহিক সাফল্য, অন্যদিকে জিপিএ-৫ অর্জনে ছেলেদের এগিয়ে থাকা।

শনিবার সকালে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিলকিস বেগম। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। তবে লিঙ্গভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পাসের হার বেশি।

বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ৭১ হাজার ৮৯৩ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ছেলে পরীক্ষার্থী ছিল ২৮ হাজার ৯৩৫ জন এবং মেয়ে পরীক্ষার্থী ছিল ৪২ হাজার ৯৫৮ জন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ১৪ হাজার ৯৬ জন ছেলে এবং ২২ হাজার ৫০১ জন মেয়ে। সে হিসাবে ছেলেদের পাসের হার ৪৮ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং মেয়েদের পাসের হার ৫২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।

এই ব্যবধান শুধু চলতি বছরের ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিগত পাঁচ বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবারই পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিকতা ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও বজায় ছিল। চলতি বছরের ফলাফল সেই ধারাবাহিকতাকে আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে সিলেট অঞ্চলের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের শিক্ষাগত অগ্রগতির একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় সিলেট বোর্ডে ছেলেদের পাসের হার ছিল ৯৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অন্যদিকে মেয়েদের পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ওই বছর মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় ২ দশমিক ০৫ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে ছিল। পরের বছর ২০২২ সালেও একই চিত্র দেখা যায়। সে বছর ছেলেদের পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং মেয়েদের ছিল ৮২ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৮১ শতাংশ পয়েন্টে।

২০২৩ সালের ফলাফলও মেয়েদের এগিয়ে থাকার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। ওই বছর ছেলেদের পাসের হার ছিল ৬৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ, আর মেয়েদের পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ০৭ শতাংশ। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ পয়েন্টে। ২০২৪ সালেও মেয়েরা এগিয়ে ছিল। সে বছর ছেলেদের পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং মেয়েদের ৮৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ব্যবধান ছিল ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ পয়েন্ট।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের ফলাফল বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা পাওয়া যায়। গত বছর সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ছেলেদের পাসের হার ছিল ৪৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং মেয়েদের ছিল ৫৩ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ মেয়েরা ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে ছিল। চলতি বছর ছেলেদের পাসের হার কমে ৪৮ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মেয়েদের পাসের হার হয়েছে ৫২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান এবার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট। এ হিসাবে গত বছরের তুলনায় ব্যবধান আরও বেড়েছে।

তবে পাসের হারে মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রে এবার ছেলেরা সামান্য এগিয়ে রয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডে মোট ১ হাজার ২০৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর মধ্যে ৬১৩ জন ছেলে এবং ৫৯১ জন মেয়ে। অর্থাৎ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলেদের সংখ্যা মেয়েদের তুলনায় ২২ জন বেশি। সামগ্রিক পাসের হারে মেয়েদের এগিয়ে থাকার বিপরীতে সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনে ছেলেদের এই সামান্য ব্যবধান এবারের ফলাফলে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

পরিসংখ্যানের এই দুই ধরনের চিত্র শিক্ষার্থীদের ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাসের হার একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে কত শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে, তা তুলে ধরে। অন্যদিকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনকারীদের পরিমাণ নির্দেশ করে। তাই শুধু জিপিএ-৫-এর সংখ্যা দিয়ে সামগ্রিক শিক্ষাগত সাফল্য বিচার করা যায় না। আবার পাসের হার বেশি হলেই সব শিক্ষার্থীর ফলাফল সমানভাবে ভালো হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো ঠিক নয়। দুই ধরনের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে শিক্ষার্থীদের অর্জন সম্পর্কে তুলনামূলক পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

এবারের ফলাফলে মেয়েদের পাসের হার বেশি হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পরীক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণও ছিল বেশি। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪২ হাজার ৯৫৮ জন মেয়ে এবং ২৮ হাজার ৯৩৫ জন ছেলে অংশ নেয়। অর্থাৎ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পরীক্ষার্থী ছিল ১৪ হাজার ২৩ জন বেশি। অংশগ্রহণের এই ব্যবধানের পাশাপাশি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যাতেও মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। তবে এ ফলাফলের পেছনে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতি, নিয়মিত পড়াশোনা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং পারিবারিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে।

সিলেট শিক্ষা বোর্ডের এবারের সামগ্রিক ফলাফল অবশ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাসের হার ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে আসায় প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। বোর্ডের অধীনে এবার ৭১ হাজার ৮৯৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৬ হাজার ৫৯৭ জন। অন্যদিকে ৩৫ হাজার ২৯৬ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার আরও কমেছে।

জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও অবনতি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে সিলেট বোর্ডে ১ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। চলতি বছর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০৪ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩৯৮ জন। ফলে মেয়েদের পাসের হারে এগিয়ে থাকার ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি সামগ্রিক ফলাফলের অবনতিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মেয়েদের ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে থাকার বিষয়টি নারী শিক্ষার অগ্রগতির একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ছেলেদের ফলাফল তুলনামূলক পিছিয়ে থাকার কারণও তথ্যভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। কোন বিভাগে, কোন বিষয়ে কিংবা কোন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়ছে, তা চিহ্নিত করতে পারলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।

বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু যথাযথভাবে বোঝা, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুধু পরীক্ষার আগে অতিরিক্ত পড়াশোনার ওপর নির্ভর না করে শিক্ষাবর্ষজুড়ে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা গেলে দুর্বলতা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষায় যে অগ্রগতির চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা ধরে রাখার পাশাপাশি ছেলেদের শিক্ষাগত ফল উন্নয়নে কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সিলেট বোর্ডের গত পাঁচ বছরের ফলাফল তাই একদিকে মেয়েদের ধারাবাহিক অগ্রগতির বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে সামগ্রিক শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরছে। পাসের হারে মেয়েদের এগিয়ে থাকা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য প্রবণতা। তবে প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত ছেলে ও মেয়ে উভয় শিক্ষার্থীর জন্য সমান মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ কিংবা পাসের হারের বাইরে শিক্ষার্থীরা কতটা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই সিলেট অঞ্চলের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ইতালিতে ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘট, রাজপথে হাজারো মানুষ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার জামায়াত আমিরের

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তাহসিফ হত্যা: বন্ধু দীপের চার দিনের রিমান্ড

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাল্লায় বাড়িঘর ভাঙচুর, ৩৫ লাখ টাকার লুটের অভিযোগ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য জব্দ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

ইতালিতে ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘট, রাজপথে হাজারো মানুষ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার জামায়াত আমিরের

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তাহসিফ হত্যা: বন্ধু দীপের চার দিনের রিমান্ড

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাল্লায় বাড়িঘর ভাঙচুর, ৩৫ লাখ টাকার লুটের অভিযোগ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য জব্দ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট বোর্ডে এইচএসসির ফল বিপর্যয়, পাসের হার ৫০.৯০%

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হাম ও উপসর্গে শিশুমৃত্যু ১ হাজার ২৫১ ছাড়াল

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ