ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে ৫৪ আসন নিয়ে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে সাত আসন পিছিয়ে ছিল। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের ৪৭ আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর ১৯ আসন যোগ করলে তাত্ত্বিকভাবে সরকার গঠনের পক্ষে ৬৬ আসনের সমর্থন পাওয়া সম্ভব। তবে আসনসংখ্যার এই যোগফলই সরকার গঠনের নিশ্চয়তা নয়; রাজনৈতিক সমঝোতা ও জোটের শর্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কে সরকার গঠন করতে পারবেন।
ভোট গণনার ওই পর্যায়ে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন নিয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছিল। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি ২০টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। আরব দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্ট ১৩টি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের বেয়াহাদ পার্টি ১১টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।
দলীয় আসনসংখ্যায় লিকুদ এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের হিসাব নির্ভর করছে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটের ওপর। ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো একটি দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সরকার গঠন করতে হয়। এ কারণে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলটির পক্ষেও সরকার গঠন নিশ্চিত করা যায় না।
এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তেমনি বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার সক্ষমতাও বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা ও আরব দলগুলোর অবস্থান শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ভোট গণনার ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যায়ে আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৬ থেকে বেড়ে ১৯-এ পৌঁছানোকে নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জয়েন্ট লিস্ট ও ইসলামপন্থী দল রা’আমের আসন বৃদ্ধির কারণে সরকার গঠনের হিসাবেও তাদের গুরুত্ব বেড়েছে।
জয়েন্ট লিস্টের চেয়ারম্যান ইউসেফ জাবারিন বলেছেন, নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রচেষ্টায় আরব দলগুলো তাদের রাজনৈতিক শক্তি কাজে লাগাতে প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আরব নাগরিকদের অধিকার ও সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান সরকারের নীতির পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে তারা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়।
জাবারিন নেতানিয়াহু, ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তির বিরোধিতা করে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরিতে আরব দলগুলো ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আলোচনায় আরব দলগুলো নিজেদের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
তবে আরব দলগুলোর আসন বৃদ্ধি মানেই তারা বিরোধী জোটের সঙ্গে একযোগে সরকার গঠন করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিরোধী শিবিরের মধ্যেও আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার গাণিতিক হিসাব বাস্তবে রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর অবস্থানের ওপর।
ভোট গণনার ওই পর্যায়ে দক্ষিণ ইসরায়েলের বেদুইনপ্রধান কয়েকটি শহরে রা’আম উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাহাত শহরের ৩১টি কেন্দ্রের গণনা শেষে দলটি ৮৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। সেখানে জয়েন্ট লিস্টের ভোট ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
এ ছাড়া কুসেইফ শহরের পাঁচটি ভোটকেন্দ্রের হিসাবে রা’আম পেয়েছিল ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট, আর জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। কাফর কাসিম শহরেও রা’আমের সমর্থন ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব এলাকার ফলাফল দলটির আসন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে স্থানীয় কয়েকটি শহরের ফলাফল দিয়ে পুরো দেশের ভোটের প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। ইসরায়েলের বিভিন্ন অঞ্চলের ভোট গণনা, ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দ এবং নির্বাচনী বাধা অতিক্রমের হিসাব মিলিয়েই চূড়ান্ত আসনবণ্টন নির্ধারিত হবে।
ইসরায়েলের নির্বাচনে পার্লামেন্টে আসন পেতে কোনো দলকে মোট ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ অর্জন করতে হয়। ভোট গণনার ওই পর্যায়ে রিজার্ভিস্টস পার্টি ২ দশমিক ৬ শতাংশ, পিপল অব ইসরায়েল ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং হারেদি পাবলিক শূন্য দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। ফলে তখন পর্যন্ত দলগুলো নির্বাচনী বাধা অতিক্রম করতে পারেনি।
এই সীমা অতিক্রম করতে না পারা দলগুলোর ভোট আসনবণ্টনের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। ভোট গণনা শেষ হলে কোন দল কত আসন পাবে এবং কোনো দল নির্বাচনী বাধা অতিক্রম করতে পারবে কি না, তার ওপর নির্ভর করবে পার্লামেন্টের চূড়ান্ত চিত্র।
এদিকে, দ্বৈত খাম পদ্ধতিতে দেওয়া ভোট গণনা বাকি থাকায় নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, প্রাথমিক ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে। এসব ভোটের মধ্যে সেনাসদস্যদের ভোটও রয়েছে। ফলে ভোট গণনা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো জোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা যাচ্ছে না।
ভোট গণনার ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যায়ের হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫৪ আসনে আটকে থাকায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেনি। অন্যদিকে, বিরোধী জোট ও আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনা তৈরি করলেও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা বড় চ্যালেঞ্জ।
পরবর্তী সময়ে ভোট গণনার অগ্রগতির সঙ্গে আসনবণ্টনে পরিবর্তন এসেছে। দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এর পরবর্তী হালনাগাদে ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী নেতানিয়াহুর জোট ৫৪ আসনে থাকলেও আইজেনকটের জোটের আসন বেড়ে ৪৯ এবং আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসন কমে ১৭ হয়েছিল। এ পরিবর্তনই প্রমাণ করে, গণনা চলাকালে প্রাথমিক ফলাফলকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এখন নজর থাকবে ভোট গণনার চূড়ান্ত ফল, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আলোচনা এবং সরকার গঠনের সম্ভাব্য সমঝোতার দিকে। নেতানিয়াহু আবারও সরকার গঠনের মতো সমর্থন জোগাড় করতে পারবেন, নাকি বিরোধী দলগুলো বিকল্প সরকার গঠনের পথ তৈরি করবে—তা নির্ধারিত হবে আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায়।

