বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে সিলেট সিটি করপোরেশনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন সিসিকের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেন, একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশা পূরণে পেশাগত দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা এবং সরকারি বিধিবিধান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাত্ত্বিক জ্ঞান বাড়ানো নয়; বরং দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজে সেই জ্ঞানের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। প্রশাসনিক কাজের স্বচ্ছতা, নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে, প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু সেই লক্ষ্য অর্জনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে নাগরিকদের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে। তাই প্রত্যেক কর্মকর্তাকে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান মেনে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দাপ্তরিক গোপনীয়তা রক্ষা এবং সরকারি আইনকানুন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা প্রত্যেক কর্মকর্তার জন্য আবশ্যক। শুধু চাকরির প্রয়োজনে কিংবা কোনো পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানোই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা বলতে শুধু ফাইল নিষ্পত্তি বা নিয়ম মেনে দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করাকে বোঝায় না। এর সঙ্গে সময়মতো সেবা দেওয়া, নাগরিকদের প্রয়োজন বুঝতে পারা, সঠিক তথ্য সরবরাহ করা এবং দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ও জড়িত। নগরবাসীর বিভিন্ন সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা অনেকাংশে নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত আচরণ ও কাজের দক্ষতার ওপর।
সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নাগরিকদের নানা ধরনের প্রয়োজন নিয়ে প্রতিদিন যোগাযোগ করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা যদি নিয়মকানুন সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত থাকেন এবং সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে পেশাদার আচরণ করেন, তাহলে কাজের জটিলতা কমানো ও সেবার মান বাড়ানো সম্ভব। এ কারণে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগকে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সিসিকের আয়োজনে সাত দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রথম ধাপে দাপ্তরিক আচরণ, প্রটোকল, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট এবং রাজস্ব আহরণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছেন মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
দাপ্তরিক আচরণ ও প্রটোকল সম্পর্কে যথাযথ ধারণা থাকলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন, পারস্পরিক সমন্বয় এবং আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও সুশৃঙ্খল ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়মতান্ত্রিক যোগাযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার বজায় রাখা প্রশাসনিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টসহ সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে ধারণা থাকা দাপ্তরিক তথ্য ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোন তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধানের আলোকে বুঝতে পারা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ এবং দায়িত্বের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকাও জরুরি।
প্রশিক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রাজস্ব আহরণ। সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন ও নাগরিকসেবা কার্যক্রম পরিচালনায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ভূমিকা রয়েছে। নির্ধারিত রাজস্ব যথাযথভাবে আহরণ, হিসাব সংরক্ষণ এবং প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়লে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন। তবে প্রশিক্ষণের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে অর্জিত জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন আসছে এবং নাগরিকসেবার মান কতটা উন্নত হচ্ছে, তার ওপর।
প্রশিক্ষণ পরিচালনায় মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের যুক্ত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তাঁর মতে, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কে আরও বাস্তবভিত্তিক ধারণা লাভ করতে পারবেন। এর ফলে দাপ্তরিক কাজের গতি বাড়বে এবং নাগরিকদের উন্নত সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রযোজ্য বিধিবিধানের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দাপ্তরিক কাজে অনেক সময় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়; বরং আইনগত কাঠামো বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের নির্দেশনা এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত ধারণা আরও সুসংহত করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে প্রশিক্ষণের সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে নিয়মিত মূল্যায়ন, কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে পরবর্তী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে কতটা প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা মূল্যায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু আরও কার্যকরভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের সচিব মো. আশিক নূরের সভাপতিত্বে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (অঞ্চল-২) সুমন চন্দ্র দাশ, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (অঞ্চল-৫) নূসরাত লায়লা নীরা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমান।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
সপ্তাহব্যাপী এ উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজে নিয়মশৃঙ্খলা, দায়িত্বশীলতা এবং সমন্বয় জোরদারের প্রত্যাশা করছে সিসিক। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা নিজেদের দায়িত্ব আরও কার্যকরভাবে পালন করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
একটি আধুনিক ও জনবান্ধব সিটি করপোরেশন গড়ে তুলতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনবলও গুরুত্বপূর্ণ। নগরীর সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আহরণ ও অন্যান্য নাগরিকসেবা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ কর্মী।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির এ উদ্যোগ সিসিকের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান দৈনন্দিন কাজে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার ওপর। নাগরিকদের অভিযোগ ও আবেদন নিষ্পত্তিতে সময়ানুবর্তিতা, তথ্য প্রদানে স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রশিক্ষণের সুফল সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
সিসিকের সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তাই শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নের আয়োজন নয়; বরং নাগরিকসেবার মান বাড়ানোর একটি সুযোগও। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানো এবং নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের সেবাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করে তোলার পথ সুগম হতে পারে।


