হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক কাঁকন দে এ রায় দেন। আদালতের স্টেনোগ্রাফার মো. মুখলেছুর রহমান রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত অলিউর রহমান অলি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তুলশীপুর (অলিপুর) গ্রামের মো. ইউনুছ আলীর ছেলে। রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মে মাসে স্বর্ণালংকার কেনার কথা বলে শাশুড়ি জাহানারা বেগমকে বাড়ি থেকে নিয়ে যান অলিউর রহমান। এরপর নিখোঁজ হয়ে যান জাহানারা। তিন দিন পর চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একটি বেতবাগান থেকে তাঁর গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে এ ঘটনায় নিহতের ছেলে মো. মিজানুর রহমান বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষে আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৯ মে সকালে জাহানারা বেগমকে স্বর্ণালংকার কেনার কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে যান তাঁর জামাতা অলিউর রহমান অলি। স্বজনদের কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও এরপর থেকে জাহানারা বেগমের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি পরিবারের উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে।
পরিবারের সদস্যরা যখন তাঁর সন্ধানে উদ্বিগ্ন, তখন ১ জুন চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ওয়াচ টাওয়ারের দক্ষিণ পাশে একটি বেতবাগান থেকে এক নারীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের অবস্থা এমন ছিল যে পরিচয় শনাক্ত করা জরুরি হয়ে পড়ে। পরদিন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ দেখে নিহতের ছেলে মো. মিজানুর রহমান মরদেহটি তাঁর মা জাহানারা বেগমের বলে শনাক্ত করেন।
একজন স্বজনের নিখোঁজ হওয়া এবং পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা যে কোনো পরিবারের জন্য গভীর বেদনার। জাহানারা বেগমের ক্ষেত্রেও নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পরিবারের জন্য শোকাবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী ঘটেছিল, তা নির্ধারণের দায়িত্ব পড়ে তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের ওপর।
মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় মো. মিজানুর রহমান বাদী হয়ে অলিউর রহমান অলির বিরুদ্ধে চুনারুঘাট থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর পুলিশ অলিউর রহমানকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আদালতে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
তবে কোনো মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থাকলেই বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না। আদালতকে মামলার অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ, তদন্তের তথ্য এবং প্রাসঙ্গিক আইনগত বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ মামলাতেও তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং পরবর্তী সময়ে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি অলিউর রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। এরপর মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে এগিয়ে যায়। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ, আসামিপক্ষের জেরা এবং উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে মামলার বিচার সম্পন্ন হয়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত অলিউর রহমান অলিকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। সাজা ছাড়াও তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
রায় ঘোষণার সময় আসামির আদালতে উপস্থিত থাকার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন আদালতের স্টেনোগ্রাফার মো. মুখলেছুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) মো. গুলজার আহমেদ খান।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, তাঁরা মামলাটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ ধরনের হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ ভবিষ্যতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখবে বলেও জানান তিনি।
২০১৮ সালের ২৯ মে জাহানারা বেগমকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর রায় ঘোষণা—মামলাটির বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বিচারিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আট বছরের বেশি সময় লেগেছে। এর মধ্যে রয়েছে মরদেহ উদ্ধার, পরিচয় শনাক্তকরণ, হত্যা মামলা দায়ের, আসামি গ্রেপ্তার, তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া।
ফৌজদারি মামলায় তদন্তের মান, সাক্ষীদের সাক্ষ্য, প্রাসঙ্গিক নথি এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের গুরুত্ব অপরিসীম। হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে যেমন প্রয়োজন যথাযথ তদন্ত, তেমনি প্রয়োজন নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়া। এ মামলার রায় সেই বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।
তবে রায় ঘোষণার পর আপিল বা অন্য কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই মামলাটির পরবর্তী আইনগত অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের প্রয়োজন রয়েছে।
জাহানারা বেগম হত্যা মামলার রায় আবারও সামনে এনেছে গুরুতর অপরাধের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তা যথাযথভাবে তদন্ত করা, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আদালতে সেগুলো যাচাইয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের ঘোষিত রায়ে অলিউর রহমান অলিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এখন মামলার পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


