এ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একই অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে। তবে অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম। তাঁর দাবি, নির্মাণকাজের অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসায় ঠিকাদার তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলেছেন।
সমকাল ও সিলেট টুডে ২৪-এর পৃথক প্রতিবেদনে অভিযোগ, নির্মাণকাজ বন্ধ এবং সংসদ সদস্যের বক্তব্যের বিষয়ে একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা, চাঁদা দাবির সঙ্গে কাজ বন্ধের ঘটনার সম্পর্ক এবং শ্রমিকদের ওপর হামলার বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রাপ্ত সংবাদতথ্য অনুযায়ী, ইসলাম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিরখলা-১ সেতু ও সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর অভিযোগ, কাজ শুরু করার পর থেকেই বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে। একপর্যায়ে সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ তোলেন তিনি।
ঠিকাদারের দাবি, চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় নির্মাণকাজ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও মাধ্যম ব্যবহার করে তাঁকে চাপ দেওয়া হয়েছে এবং হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধের জেরে গত ২০ অক্টোবর মুক্তিরখলা-১ সেতুর নির্মাণকাজ দুই দফায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ২৭ অক্টোবর সালামপুর সেতুর কাজ নিয়েও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তবে প্রকল্পের ব্যয়সংক্রান্ত তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্নভাবে এসেছে। কোথাও দুটি সেতুর কাজের সম্মিলিত মূল্য ৮৭ কোটি টাকা বলা হয়েছে, আবার অন্য একটি প্রতিবেদনে মুক্তিরখলা সেতুর জন্য ৮ কোটি ৮৭ লাখ ৯৯ হাজার ৫০৮ টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি কার্যাদেশ ও প্রকল্পের নথি যাচাই ছাড়া এ অঙ্কগুলোর মধ্যে কোনটি কোন কাজের জন্য প্রযোজ্য, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের অভিযোগ, ২৭ অক্টোবর সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম। ওই দিন বিকেলে এলাকা দিয়ে ফেরার সময় তিনি কাজ বন্ধ রাখতে বলেন বলে দাবি ঠিকাদারের। এ সময় সংসদ সদস্যের সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মারধর করেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় নির্মাণকাজে ব্যবহৃত রোলারের চালক মনির, পে-লোডার চালক কবির আহমদ ও সাইট ঠিকাদার হোসেন আহমদ আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁদের আঘাতের ধরন, চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য এবং ঘটনার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রতিবেদন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটিরও যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কাজের অনিয়ম থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা শনাক্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি যেন ভয়ভীতি, বলপ্রয়োগ বা অনানুষ্ঠানিক চাপের মাধ্যমে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
শফিকুল ইসলাম তাঁর আবেদনে সংসদ সদস্য ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি, প্রাণনাশের হুমকি, হয়রানি, পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সরকারি উন্নয়নকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। তিনি এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছেন।
ঠিকাদারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধের জেরে তাঁকে একাধিক মামলায় আসামি করা হয়েছে এবং তাঁর সিলেটের বাসায় পুলিশও পাঠানো হয়েছিল। তিনি আশঙ্কা করছেন, এসব ঘটনার কারণে তাঁর ব্যবসা ও ঠিকাদারি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে মামলাগুলোর প্রকৃত অবস্থা, সেগুলোতে তাঁর সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন এবং পুলিশি তৎপরতার আইনগত ভিত্তি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, তদন্তের অগ্রগতি ও পুলিশের বক্তব্য প্রয়োজন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত ৫ অক্টোবর জেলা যুবদলের এক নেতা তাঁকে ফোন করে হুমকি দেন। পরে ২০ অক্টোবর সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের এক নেতা সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি মীমাংসার জন্য চাপ দেন বলেও দাবি করেছেন শফিকুল। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, ফোনকলের তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল বলেছেন, ঠিকাদার শফিকুল ইসলামকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে স্থানীয় লোকজন সালামপুর সেতুর গার্ডওয়াল নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি তাঁকে দেখান। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে পরদিন সরেজমিনে বিষয়টি দেখার কথা জানান।
সংসদ সদস্যের বক্তব্য, নির্মাণকাজ বন্ধ করা কিংবা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ ভিত্তিহীন। তাঁর মতে, ঠিকাদারকে প্রমাণ করতে হবে কে চাঁদা দাবি করেছেন এবং কে তাঁকে হুমকি দিয়েছেন। অর্থাৎ একদিকে ঠিকাদার চাঁদা দাবি ও নির্মাণকাজে বাধার অভিযোগ তুলছেন, অন্যদিকে সংসদ সদস্য কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগগুলো অস্বীকার করছেন।
এই দুই বিপরীত বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণকাজের মান যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের কারিগরি পরিদর্শন, কাজের নথিপত্র ও পরিমাপপত্র পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া যেতে পারে। একইভাবে চাঁদা দাবির অভিযোগ যাচাইয়ে লিখিত আবেদন, যোগাযোগের রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ঘটনার সময়কার প্রাসঙ্গিক তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সেতু নির্মাণের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ, যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জরুরি সেবা পাওয়ার বিষয় জড়িত। নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে প্রকল্পের সময়সীমা বাড়তে পারে, জনদুর্ভোগ তৈরি হতে পারে এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। এ কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যয়, নির্মাণমান ও নিরাপত্তা—সবকিছুই স্বচ্ছতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় ঠিকাদারের অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার, তেমনি সংসদ সদস্যের তোলা নির্মাণকাজের অনিয়মের অভিযোগও উপেক্ষা করা উচিত নয়। কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়, বরং নথি, সাক্ষ্য, কারিগরি প্রতিবেদন এবং প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে দায়িত্বশীল পন্থা।
বিশেষ করে নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ঠিকাদারি বিরোধের বিষয় নয়; এটি কর্মীদের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রশ্নও। আহত ব্যক্তিদের বক্তব্য, চিকিৎসার নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং ঘটনাস্থলের প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংগ্রহ করে অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জের মুক্তিরখলা-১ ও সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজ ঘিরে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তার দ্রুত ও স্বচ্ছ নিষ্পত্তি প্রয়োজন। ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ তদন্ত হলে চাঁদা দাবি, হুমকি, হয়রানি ও নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সেতুর নির্মাণমান নিয়ে সংসদ সদস্যের অভিযোগও কারিগরি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা দরকার।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, প্রকৌশল বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হবে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। তদন্তে যে পক্ষের বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণিত হোক না কেন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও কর্মীদের নিরাপত্তা এবং জনস্বার্থে প্রকল্পের কাজ স্বচ্ছ নিয়মে এগিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।


