সোমবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহের উন্নয়নকাজ পরিদর্শনকালে এসব কথা বলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি জানান, শাহী ঈদগাহকে শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে নতুন রূপ দেওয়া নয়, বরং এর ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে ধরে রাখাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
সিসিক প্রশাসক বলেন, শাহী ঈদগাহ সিলেটের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এমনভাবে উন্নয়ন করা হবে, যাতে দূর থেকে দেখলেও স্থাপনাটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একই সঙ্গে ঈদগাহের পবিত্র পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
শাহী ঈদগাহ সিলেটের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক স্থান। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জামাতে বিপুলসংখ্যক মুসল্লির সমাগমের কারণে এ স্থাপনার গুরুত্ব স্থানীয় সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলেও বিস্তৃত। তাই এর উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের ক্ষেত্রে শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, বরং ঐতিহ্য, ধর্মীয় পরিবেশ ও স্থাপনার স্বকীয়তা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, শাহী ঈদগাহকে হেরিটেজ বা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ এমনভাবে করা হবে, যাতে ঈদগাহের মূল বৈশিষ্ট্য ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ন থাকে।
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। কারণ, অপরিকল্পিত পরিবর্তন অনেক সময় কোনো স্থাপনার মূল নকশা, পরিবেশ ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে শাহী ঈদগাহের সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমেও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় রাখার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শাহী ঈদগাহের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন সিসিক প্রশাসক। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এখানে সভা-সমাবেশ কিংবা মেলা আয়োজনের মতো কার্যক্রম হবে না। ঈদগাহের পরিবেশ ও পবিত্রতা বজায় রেখে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হবে।
ধর্মীয় স্থাপনার পরিবেশ রক্ষা করা শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, দীর্ঘদিনের ব্যবহার এবং সামাজিক ঐতিহ্যও জড়িত। বিশেষ করে ঈদের জামাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজনে মুসল্লিদের স্বাচ্ছন্দ্য, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ কারণে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের সময় স্থাপনাটির ধর্মীয় ব্যবহার যেন ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের মান, পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সৌন্দর্যবর্ধনের সুফল দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে।
স্থানীয় এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, শাহী ঈদগাহের ইতিহাসে এবারই প্রথম প্রায় ৫ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর আগে এত বড় পরিসরে উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়নি বলে দাবি তাঁদের। এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তাঁরা সিসিক প্রশাসককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং চলমান কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন।
তবে প্রায় ৫ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় ঠিক কোন কোন অবকাঠামোগত কাজ করা হবে, প্রকল্পটির নির্দিষ্ট মেয়াদ কত এবং কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময়সীমা কী—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, দরপত্রের শর্ত, কার্যাদেশ এবং ব্যয়ের খাত প্রকাশ করা হলে নগরবাসী উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাবেন।
সরকারি অর্থে পরিচালিত উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি মান অনুসরণ করে কাজ সম্পন্ন করা, ব্যয়ের যথাযথ হিসাব রাখা এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা হলে প্রকল্পের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
উন্নয়নকাজ পরিদর্শনের সময় সিলেট সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামসুল হক পাটোয়ারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, শাহী ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে উন্নয়নকাজের অগ্রগতি ও স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ সৌন্দর্যবর্ধন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গুরুত্বের বিষয়টি উঠে আসে।
সিসিক প্রশাসক জানিয়েছেন, উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করে ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে। এ ক্ষেত্রে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ধর্মীয় পবিত্রতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিই তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়।
পরিদর্শন শেষে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী উপশহরের সোনারপাড়া সড়কের উন্নয়নকাজও পরিদর্শন করেন। নগরীর বিভিন্ন এলাকার উন্নয়নকাজ সরেজমিনে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবেই এ পরিদর্শন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাহী ঈদগাহের উন্নয়ন উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয়দের প্রত্যাশা শুধু একটি স্থাপনাকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা চান, ধর্মীয় পবিত্রতা বজায় রেখে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হোক, যেখানে মুসল্লিরা স্বাচ্ছন্দ্যে নামাজ আদায় করতে পারবেন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাটির স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন থাকবে।
উন্নয়নকাজের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন, নির্মাণমান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপর। সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি স্থাপনাটির পরিচ্ছন্নতা, ব্যবহার উপযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ সিলেটের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সিলেটের ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহকে ঘিরে প্রায় ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন উদ্যোগ তাই নগরবাসীর কাছে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এখন সংশ্লিষ্টদের নজর থাকবে কাজের মান, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী ঈদগাহের ঐতিহ্য ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রাখার দিকে।


