প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন আবারও নামঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (৫ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। ডনের পক্ষে আইনজীবী মো. মফিজুল ইসলাম আসলাম জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আবেদনটি নাকচ করে দেন।
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর নতুন করে হত্যা মামলা হওয়া এবং সেই মামলায় চলচ্চিত্রের পরিচিত অভিনেতা ডনের গ্রেপ্তার ও কারাগারে যাওয়ার বিষয়টি এরই মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ায় মামলাটির পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের দিকে এখন নজর রয়েছে।
আদালতে ডনের পক্ষে আইনজীবী দাবি করেন, তাঁর মক্কেলকে মামলায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হয়েছে। শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রয়োজনে ডন খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করলেও বাস্তব জীবনে তিনি খলনায়ক নন। তাঁর দাবি, মামলায় ডনকে অন্যায়ভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
জামিন আবেদনে আসামিপক্ষ সালমান শাহর মৃত্যুর সময়কার বিভিন্ন নথির কথাও তুলে ধরে। আইনজীবীরা দুইটি সুরতহাল প্রতিবেদন, দুইটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ভিসেরা ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, এসব নথিতে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়। এ যুক্তির ভিত্তিতে ডন জামিন পাওয়ার যোগ্য বলে আবেদন করা হয়। তবে আদালত শেষ পর্যন্ত জামিন আবেদন গ্রহণ করেননি।
ডনের জামিন নামঞ্জুরের ঘটনা এ মামলায় তাঁর আইনি অবস্থানের নতুন একটি অধ্যায় তৈরি করেছে। এর আগে আগস্টেও তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়েছিল। পরে মহানগর দায়রা আদালতেও তিনি জামিন পাননি। ফলে একাধিকবার জামিনের চেষ্টা করেও আপাতত কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না তিনি।
আশরাফুল হক ডনকে চলতি বছরের ৯ আগস্ট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন এলাকা থেকে আটক করা হয়। তিনি সৌদি আরবে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে সালমান শাহ হত্যা মামলায় বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে আটক করা হয় এবং পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আটকের পর আদালতের মাধ্যমে তাঁকে মামলার তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়। পরে পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে ৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁর জামিনের আবেদন করা হলেও তা মঞ্জুর হয়নি।
সালমান শাহ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা ছিলেন। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে নিজের বাসায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর ঘটনাটি প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিল। পরে সালমান শাহর পরিবার তাঁর মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটনাটি বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত রহস্য হিসেবে থেকে যায়।
মামলার ইতিহাসও দীর্ঘ। সালমান শাহর মৃত্যুর পর তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবার থেকে হত্যার অভিযোগ তোলা হয়। বিভিন্ন সময়ে একাধিক সংস্থা ঘটনাটি তদন্ত করেছে। তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে সালমান শাহর মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। ফলে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি।
পরবর্তী সময়ে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে আশরাফুল হক ডনও রয়েছেন। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সামিরা হকের মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই এবং আরও কয়েকজন।
এই মামলার তদন্তের ইতিহাসেও একাধিক মোড় এসেছে। এর আগে র্যাব তদন্তের দায়িত্ব পেলেও পরে আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পরিবর্তন হয়। এরপর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলাটি তদন্ত করে ২০২০ সালে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেই প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণ করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে নতুন করে হত্যা মামলা হওয়ায় বিষয়টি আবার আদালতের সামনে আসে। নতুন মামলায় পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ফলে আগের তদন্ত ও নতুন মামলার অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য নিয়েও আইনি ও জনপরিসরে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় মামলার বর্তমান তদন্তে কী তথ্য পাওয়া যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক আদালত কার্যক্রম অনুযায়ী, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে আদালত আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় নির্ধারণ করেন। অর্থাৎ এখন তদন্তকারীদের সামনে মামলার অভিযোগ, আসামিদের সংশ্লিষ্টতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অন্যান্য আলামত যাচাই করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার সময়সীমা রয়েছে।
এদিকে ডনের আইনজীবীদের বক্তব্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে সালমান শাহর মৃত্যুর আগের তদন্ত ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি। তাঁদের দাবি, এসব নথিতে আত্মহত্যার বিষয়টি উঠে এসেছে এবং নতুন মামলায় ডনকে আসামি করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। অন্যদিকে বাদীপক্ষের অভিযোগ হলো, সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এই দুই ভিন্ন অবস্থানের সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে সালমান শাহর ভক্তদের কাছেও তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নব্বইয়ের দশকে অল্প সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অভিনেতার অকালমৃত্যু তাঁর ক্যারিয়ারের পাশাপাশি দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসেও একটি গভীর শূন্যতা তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে তাঁর অভিনীত সিনেমা ও গান নতুন প্রজন্মের কাছেও পরিচিত হয়েছে। ফলে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে যেকোনো নতুন আইনি পদক্ষেপই স্বাভাবিকভাবে জনমনে আগ্রহ তৈরি করে।
তবে আলোচিত হলেও মামলাটির প্রতিটি অভিযোগ ও পাল্টা দাবিকে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোনো আসামি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। একইভাবে বাদীপক্ষের অভিযোগও তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়।
আশরাফুল হক ডনের সর্বশেষ জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর তিনি আপাতত কারাগারেই থাকছেন। সামনে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং পরবর্তী আদালত কার্যক্রমে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে। প্রায় ৩০ বছর ধরে আলোচিত সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের এই নতুন আইনি অধ্যায় শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

