প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশকে নিরাপদ, আকর্ষণীয় ও আস্থাশীল বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলে একটি শক্তিশালী ইনভেস্টমেন্ট ও ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে ৩ থেকে ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের আন্তর্জাতিক সংলাপ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকর্মীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সম্মেলনে ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তি, জলবায়ু, গণতন্ত্র, সুশাসন এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সমতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে দেশি-বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা এবং একটি পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলেও তিনি জানান। তাঁর বক্তব্যে অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে চায় যেখানে বিনিয়োগের পাশাপাশি উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর, নৌপথ এবং উপকূলীয় অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে সহযোগিতা বাড়াতে পারলে বাণিজ্য, জ্বালানি, পর্যটন, মৎস্য, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ডের মতো উদ্যোগকে সমন্বিত করে ভবিষ্যতে একটি ইউনিভার্সেল কার্ডের আওতায় নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি সেবা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এর মাধ্যমে সরকারি সহায়তা ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয় এবং সহজপ্রাপ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও নিজের সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার লক্ষ্য শুধু সার্টিফিকেট অর্জন নয়; শিশুদের আনন্দের সঙ্গে শেখার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ জন্য শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড ডে মিল ও উপবৃত্তির মতো সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, ভাষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় ঘটানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তুলতে ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি ও স্টার্টআপ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দক্ষ তরুণদের জন্য দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের সুযোগ তৈরির কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। মেধাপাচারের পরিবর্তে দক্ষ জনশক্তিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন প্রকৃত অর্থে জনগণের সেবা করে, সে ধরনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। আইনের শাসন প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন সরকারপ্রধান।
কৃষি খাতকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের প্রযুক্তি, সেচ, কৃষিঋণ ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মৎস্য, পশুপালন ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তাকে সমন্বিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়েও বড় পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে দেশের ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। সরকারের মতে, এসব পদক্ষেপ কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বন্যা, খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। সৌরশক্তির সম্প্রসারণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়ার কথা জানান তিনি। বাংলাদেশে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড-সার্টিফায়েড কারখানার মধ্যে ৫৩টি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখাকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। তাঁদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সংকটের মূল কারণ সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংকটের সূত্রপাত যেহেতু মিয়ানমারে, তাই এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই হতে হবে।
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু, সমুদ্রসম্পদ ও আঞ্চলিক যোগাযোগে সহযোগিতা বাড়লে নতুন বাজার তৈরি এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে।
এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। এতে দুই শতাধিক বক্তা, তিন শতাধিক প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যুক্ত রয়েছেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, গবেষক, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই সংলাপ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের জন্য সম্মেলনটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থান, জলবায়ু ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগকে সামনে রেখে নতুন নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ, কৃষি আধুনিকায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাকে একই উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতাই ভবিষ্যতে সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


