প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় সরকার ঘোষিত ‘কৃষক কার্ড’ ও কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর বিকেল ৪টায় উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দেশব্যাপী এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন নির্বাচিত উপজেলা থেকে কৃষক কার্ড কার্যক্রমের উদ্বোধনী আয়োজনে সংশ্লিষ্টরা যুক্ত ছিলেন।
শাল্লা উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাসহ কার্ডপ্রাপ্ত কৃষকেরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচির প্রাথমিক পর্যায়ে উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের ২ হাজার ১২২ জন কৃষককে কৃষক কার্ডের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দরিদ্র ও ক্ষুদ্র কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে ১ হাজার ৭৬১ জন কৃষকের ব্যাংক হিসাবে কৃষি উপকরণ সহায়তা হিসেবে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে জমা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এটি প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যক্রম। পর্যায়ক্রমে শাল্লা উপজেলার অন্যান্য কৃষককেও কৃষক কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষকদের সরকারি কৃষি সহায়তার সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত করা, বিভিন্ন সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং কৃষি উপকরণ সহায়তা সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
কৃষক কার্ড হাতে পাওয়ার পর উপকারভোগীদের মধ্যে ছিল আনন্দ ও প্রত্যাশা। কার্ডপ্রাপ্ত কৃষক আছিয়া খাতুন বলেন, কৃষক হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজ, কৃষি উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা সহজে পাওয়া গেলে তা তাদের জন্য বড় ধরনের সহায়তা হবে বলে তিনি আশা করেন।
আরেক কৃষক অমল কান্তি দাসও কার্ড পাওয়ার পর সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর প্রত্যাশা, কৃষকদের জন্য নেওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি সুযোগ-সুবিধা স্বচ্ছ ও সহজ পদ্ধতিতে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। কৃষকের কাছে কার্ডটি শুধু একটি পরিচয়পত্র হিসেবে নয়, বরং সরকারি কৃষি সহায়তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে কার্যকর হবে—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে তাঁর।
কৃষক গফুর মিয়ার কাছে কৃষক কার্ড পাওয়ার বিষয়টি আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। তাঁর ভাষ্য, দেশের খাদ্য উৎপাদনে কৃষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে উৎপাদনের সময় সার, বীজ, সেচ, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণের ব্যয় কৃষকের ওপর চাপ তৈরি করে। সরকারি সহায়তার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পাওয়া গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং কৃষকের আগ্রহও বাড়তে পারে।
নির্মল সরকারও কার্ড পাওয়ার পর আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম কেবল উদ্বোধন বা কার্ড দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর মাধ্যমে কৃষকেরা নিয়মিত ও কার্যকর সরকারি সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর প্রত্যাশা, কার্ডধারীদের কৃষি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে যেন অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি হতে না হয়।
কৃষক কার্ড কর্মসূচির জাতীয় পর্যায়ের লক্ষ্যও কৃষকদের বিভিন্ন সরকারি সেবা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কার্ডের মাধ্যমে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, কৃষি ঋণ, সেচ, কৃষিযন্ত্র, কৃষি ও প্রাণিসম্পদবিষয়ক সহায়তা এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও তথ্যসেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের আবহাওয়া, রোগবালাই ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও কর্মসূচির আওতায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষকদের তথ্যভিত্তিক একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। বাংলাদেশের কৃষিখাতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্যের হালনাগাদ, স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ এবং সেবার সমন্বয় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে আনা গেলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সেবা লক্ষ্যভিত্তিকভাবে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে কর্মসূচির বাস্তব সুফল অনেকাংশেই নির্ভর করবে কার্ডধারীরা বাস্তবে কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন এবং সেই সেবা কতটা সহজে পাচ্ছেন তার ওপর। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও দরিদ্র কৃষকদের জন্য কৃষি উপকরণের দাম, উৎপাদন ব্যয়, ঋণের সুযোগ, সেচের খরচ এবং বাজারে ফসলের ন্যায্য দাম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কৃষক কার্ডের কার্যকারিতা আরও বাড়তে পারে।
শাল্লার মতো হাওরপ্রধান এলাকায় কৃষকের বাস্তবতাও কিছুটা আলাদা। কৃষি উৎপাদন এখানে আবহাওয়া, পানি ও সময়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে কৃষকদের মৌসুমি ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়। অতিবৃষ্টি, আগাম বন্যা, ফসল কাটার সময় প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা বাজারদরের ওঠানামা কৃষকের আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সরকারি সহায়তা দ্রুত এবং সঠিক সময়ে পৌঁছানো কৃষকের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
শাল্লায় প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ১২২ জন কৃষককে কার্ডের আওতায় নেওয়ার উদ্যোগ সেই বৃহত্তর ব্যবস্থার একটি অংশ। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৭৬১ জনের হিসাবে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে জমা দেওয়ার মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। ব্যাংক হিসাবে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকায় উপকারভোগী নির্বাচন ও অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়াকে তুলনামূলকভাবে সরাসরি রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. তারিকুল ইসলাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোহাম্মদ ওমর ফারুক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দিরাই সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির।
এ ছাড়া শাল্লা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা, কৃষি বিভাগের প্রতিনিধিরা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং কৃষকেরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কৃষকদের সঙ্গে কর্মসূচির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং পর্যায়ক্রমে আরও কৃষককে এর আওতায় আনার বিষয়টি তুলে ধরেন।
কৃষক কার্ড কার্যক্রমকে ঘিরে কৃষকদের প্রত্যাশার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে ফসল উৎপাদন করা একজন কৃষকের কাছে সরকারি সহায়তা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন প্রয়োজনের সময় সেই সহায়তা পাওয়া যায়। বীজের প্রয়োজনের সময় বীজ, সার প্রয়োজনের সময় সার, কৃষিঋণের প্রয়োজন হলে সহজ শর্তে ঋণ এবং দুর্যোগে ক্ষতি হলে উপযুক্ত সহায়তা—এসব সেবা সময়মতো পৌঁছানো কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এ কারণে কার্ড বিতরণের পরবর্তী ধাপগুলো নিয়েও কৃষকদের আগ্রহ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে কার্ডধারীদের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ, প্রকৃত কৃষককে সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা, সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং অভিযোগ বা সমস্যা হলে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
শাল্লায় কৃষক কার্ডের উদ্বোধন তাই শুধু একটি নতুন কার্ড হাতে তুলে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষকদের সরকারি সেবার আওতায় আনার একটি বড় পরিকল্পনা। প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কৃষি উপকরণ, প্রশিক্ষণ, তথ্য, ঋণ, ভর্তুকি ও অন্যান্য সেবা একই কাঠামোর মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে।
কৃষকদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ও বাস্তব প্রয়োগ। কার্ডটি যদি কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে সরকারি সহায়তা পাওয়ার কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উৎপাদকদের জন্য এটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। আর সেই সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে কার্ড বিতরণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকদের সঙ্গে প্রশাসনের কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি।
শাল্লার ১ হাজার ৭৬১ কৃষকের ব্যাংক হিসাবে প্রাথমিক আর্থিক সহায়তা পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কর্মসূচির স্থানীয় বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলার আরও কৃষককে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের সরকারি সহায়তার পরিধিও বাড়তে পারে। এখন এই কর্মসূচি কতটা নিয়মিত, স্বচ্ছ ও কৃষকের প্রয়োজনভিত্তিকভাবে পরিচালিত হয়, সেটিই হবে এর কার্যকারিতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


