প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত মদ অননুমোদিত স্থানে মজুত রাখার অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের মালিকানাধীন টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডের চারটি গুদাম সিলগালা করেছে যৌথ তদন্ত দল। রাজধানীর দক্ষিণ গুলশানে বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে প্রাথমিকভাবে গুরুতর কিছু অসংগতি পাওয়ার কথা জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অধিকতর যাচাই ও তদন্তের স্বার্থে অনুমোদিত দুটি গুদামের পাশাপাশি আরও দুটি গুদামও সিলগালা করা হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের সদস্যরা যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অভিযান শুরু হয়ে শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে। অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানের গুদাম, নথিপত্র ও মজুত পণ্যের বিষয়ে যাচাই করা হয়। এরপর প্রাথমিকভাবে পাওয়া অসংগতির ভিত্তিতে চারটি গুদামই সিলগালা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডের অনুমোদিত বা ঘোষিত গুদামের সংখ্যা দুটি। কিন্তু সরেজমিন যাচাইয়ের সময় প্রতিষ্ঠানটির পণ্য চারটি গুদামে সংরক্ষিত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের আশঙ্কা, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্য অনুমোদিত স্থাপনার বাইরে সরিয়ে নেওয়া বা অপসারণের সুযোগ থাকলে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণে পণ্য স্থানান্তর ঠেকানো এবং প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন করার স্বার্থে চারটি গুদাম সিলগালা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থার আওতায় নির্দিষ্ট শ্রেণির আমদানিপণ্য শুল্ক ও কর সুবিধায় সংরক্ষণ ও সরবরাহের সুযোগ থাকে। কূটনীতিক এবং আইন অনুযায়ী বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত শুল্কমুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করতে হয়। ফলে অনুমোদিত গুদাম, পণ্যের হিসাব এবং বাস্তবে থাকা মজুতের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি থাকলে তা শুল্ক ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক তদন্তে গুদামের সফটওয়্যার ও বাস্তবে থাকা পণ্যের হিসাবের মধ্যেও কিছু অসঙ্গতির কথা উঠে এসেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফটওয়্যারে কিছু পণ্য প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে যাওয়ার তথ্য থাকলেও সরেজমিন পরিদর্শনের সময় সেগুলোর কিছু অংশ গুদামে পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে ১৪৪ ক্যান বিয়ার, ১২ বোতল হুইস্কি ও ছয় বোতল ভদকা পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানিকৃত হেইনেকেন বিয়ারের একটি চালান সফটওয়্যারে বন্ডে প্রবেশের তথ্য থাকলেও পরিদর্শনের সময় তা গুদামে না পাওয়ার বিষয়টি তদন্তকারীরা নথিবদ্ধ করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
তবে এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ আইনগত ব্যাখ্যা এখনো তদন্তাধীন। কোনো পণ্য কোথায় থাকার কথা ছিল, সংশ্লিষ্ট হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং নথিপত্রের সঙ্গে বাস্তব মজুতের পার্থক্যের কারণ কী—এসব বিষয় যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
টস বন্ডের বিরুদ্ধে এর আগেও শুল্কমুক্ত পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুল্কমুক্ত মদ অনুমোদিত ব্যক্তিদের বাইরে সরবরাহ করা হয়েছে কি না এবং বন্ড সুবিধার শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা পাল্টা বক্তব্য প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
এরই মধ্যে শেখ নুর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের বিদেশে ব্যবসা, নাগরিকত্ব এবং আর্থিক লেনদেন নিয়েও কর ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানের কথা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডা থেকে পাওয়া কিছু আর্থিক ও গোয়েন্দা তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। এসব তথ্যের মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির মালিকানা এবং একাধিক ধরনের আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের বেশ কিছু আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত কিছু লেনদেন, সন্দেহজনক লেনদেনের চেষ্টা, বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন এবং ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য থাকার কথা বলা হয়েছে। এক বছরে বিপুল অঙ্কের রেমিট্যান্স আসার তথ্যও তদন্তকারীদের নজরে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোনো লেনদেনকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা মানেই তা অবৈধ বা অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। সংশ্লিষ্ট লেনদেনের উৎস, উদ্দেশ্য, কর-সংক্রান্ত ঘোষণা এবং প্রযোজ্য আইন অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়। তাই বিদেশি সম্পদ, নাগরিকত্ব বা আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত তথ্যগুলোর ক্ষেত্রেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সালমান মুক্তাদিরের নাম সামনে আসার কারণ মূলত সাম্প্রতিক একটি হামলার ঘটনা। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দেন এবং রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে অভিযোগ তোলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ থেকে তিনি সরে আসার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত মামলায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও অনেক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়। মামলাটি ঘিরে ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের খবরও এসেছে।
তবে নুর ইসলামের গুদামে অভিযান পরিচালনার সঙ্গে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাকে সরাসরি যুক্ত করার বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, টস বন্ডের কার্যক্রম ও নুর ইসলামের ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে অনুসন্ধান আগে থেকেই চলছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিযান শুরু হয়েছে—এমনটি তারা বলছেন না।
এদিকে সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলবের খবরও সামনে এসেছে। বিষয়টি আর্থিক গোয়েন্দা অনুসন্ধানের অংশ কি না এবং এর সঙ্গে চলমান অন্যান্য তদন্তের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সংস্থার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পরই পরিষ্কার হবে।
সব মিলিয়ে টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডের চারটি গুদাম সিলগালা করার ঘটনাটি এখন শুল্ক, মাদক নিয়ন্ত্রণ, কর ও আর্থিক গোয়েন্দা অনুসন্ধানের একাধিক দিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে পাওয়া অসংগতির ভিত্তিতে গুদামগুলো সিলগালা করা হলেও অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা এখনো নির্ধারিত হয়নি। এনবিআর জানিয়েছে, বিস্তারিত যাচাই ও তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে পণ্যের হিসাব, গুদাম ব্যবস্থাপনা, শুল্ক সুবিধার ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে আরও নির্দিষ্ট তথ্য সামনে আসতে পারে।


