প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে তাঁকে নেওয়া হয়।
ডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওর বিষয়ে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই রাকিবুল হাসানকে ডিবিতে নেওয়া হয়েছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরবর্তী প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আগে ঘটনার সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
তবে অডিওটির পুরো বিষয়টি কোন প্রক্রিয়ায় তদন্ত বা অনুসন্ধান করা হচ্ছে, সে বিষয়ে ডিবি বা ডিএমপির পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানানো হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিএমপির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিতে ডিবির একজন কর্মকর্তা এবং ডিএমপি সদরদপ্তরের আরও কর্মকর্তারা রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
রাকিবুল হাসান সম্প্রতি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নামে একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। অডিওতে একজন ব্যক্তিকে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা যায়। একই কথোপকথনে পুলিশের সক্ষমতা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং পুলিশে পদায়ন নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কথাও উঠে আসে।
ছড়িয়ে পড়া অডিওতে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়েও মন্তব্য করতে শোনা যায় ওই ব্যক্তিকে। সেখানে বলা হয়, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছু করতে পারবে না। অডিওটির বক্তব্য ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তবে অডিওটির সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট, রেকর্ডটি কখন এবং কোথায় করা হয়েছে, কথোপকথনে থাকা অন্য ব্যক্তির পরিচয় এবং বক্তব্যের পেছনের বাস্তব পরিস্থিতি—এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
পুলিশের একাধিক সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে অডিওতে থাকা কণ্ঠ রাকিবুল হাসানের বলে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে অডিওর সত্যতা, সম্পাদনা করা হয়েছে কি না এবং পুরো কথোপকথনের ধারাবাহিকতা কী ছিল—এসব বিষয়ও অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো অডিওর বক্তব্যকে সরাসরি চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
অডিও ছড়িয়ে পড়ার পরই রাকিবুল হাসানকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তাঁকে ডিএমপি সদরদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সই করা অফিস আদেশে তাঁর প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ওই সময় পর্যন্ত তাঁকে বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি; তাঁকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়েছিল।
এরপর অডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধান আরও সামনে এগোয়। ডিএমপির গঠিত কমিটি রাকিবুল হাসানের বক্তব্য শোনার এবং তাঁর কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যাখ্যা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এ কারণেই তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তাদের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন পুলিশের ভূমিকা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার নামে কোনো বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে সেটির প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওপর নয়, প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ও জনআস্থার ওপরও পড়তে পারে। ফলে এমন বক্তব্যের উৎস, সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অডিওতে পুলিশে পদায়ন ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগও অডিওতে করা বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অভিযোগগুলোর পক্ষে কী ধরনের তথ্য বা প্রমাণ রয়েছে, তা এখনো প্রকাশ্যে বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। ফলে এগুলোকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। তদন্তে যদি কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই বিষয়টি মূল্যায়ন করা হবে।
এদিকে অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর রাকিবুল হাসানের বক্তব্য জানার জন্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। তবে তাঁর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাঁর পক্ষ থেকে অডিওটির সত্যতা, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দাবির বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা নিয়েও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে রাকিবুল হাসানকে গ্রেপ্তারের দাবিতে একটি আইনি নোটিশ পাঠানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে আইনি নোটিশ পাঠানো এবং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। কোনো অভিযোগের আইনগত পরিণতি নির্ভর করে তদন্ত, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
বর্তমানে রাকিবুল হাসানকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার মূল কারণ হিসেবে ভাইরাল অডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদের কথাই বলা হয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে পাওয়া যায়নি। ফলে ‘ডিবি হেফাজত’ শব্দটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এটিকে গ্রেপ্তার বা অপরাধ প্রমাণের সমার্থক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তদন্তের পর কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অডিও বা ভিডিও অনেক সময় অসম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের বক্তব্য হলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। রাকিবুল হাসানের ক্ষেত্রে এখন ডিএমপির অনুসন্ধানের ফলাফলই নির্ধারণ করবে অডিওটির বক্তব্য সম্পর্কে পরবর্তী প্রশাসনিক বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, রাকিবুল হাসানকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং ভাইরাল অডিওর বিষয়ে তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অডিওতে থাকা অভিযোগগুলোর সত্যতা বা বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান শেষ হলে ঘটনাটির প্রকৃত পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে পারে।


