প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা থেকে দুই কিশোর শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে। তিন দিন ধরে তাদের কোনো সন্ধান না মেলায় উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন স্বজনেরা। এরই মধ্যে নিখোঁজ এক শিক্ষার্থীকে মারধরের দৃশ্য দেখিয়ে ভিডিও কল এবং ভিডিও পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীর বাবার কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে।
নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থী হলো ১৫ বছর বয়সী তামিম আহমেদ ও সাঈদ মাসুদ চৌধুরী, যিনি নাঈম নামেও পরিচিত। তারা দুজনই সিলেট নগরের খাদিমপাড়া এলাকার জাবালে নূর হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থী। তামিম দক্ষিণ সুরমার বড়াইকান্দি এলাকার আবদুস সাত্তারের ছেলে। অন্যদিকে সাঈদ জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নের মউগ্রামের বেবুল আহমদের ছেলে।
পরিবার, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার ভোরে ফজরের নামাজের সময়ের মধ্যে দুজন মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর থেকে তাদের আর মাদ্রাসায় ফিরে আসার তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মতো করে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাদের সন্ধান পাননি। বিষয়টি পরে পুলিশকে জানানো হয় এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবকের পক্ষ থেকে শাহপরান থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
নিখোঁজ সাঈদের বাবা বেবুল আহমদের ভাষ্য, প্রথমে তিনি ধারণা করেছিলেন ছেলে হয়তো মাদ্রাসা থেকে বাড়ির উদ্দেশে বের হয়েছে। কিন্তু বাড়িতেও সে পৌঁছায়নি। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ করা হয়। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার সকালে ইমো অ্যাপের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর কাছে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে অর্থ দাবি করা হয় বলে তিনি জানান।
বেবুল আহমদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ওই ইমো অ্যাকাউন্টে কোনো দৃশ্যমান ফোন নম্বর ছিল না। তিনি একাধিকবার কল করলেও অপর প্রান্ত থেকে কেউ কল গ্রহণ করেনি। পরে সন্ধ্যার দিকে ভিডিও কলে তাঁর ছেলেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মারধর করা হচ্ছে—এমন দৃশ্য দেখানো হয় বলে তাঁর দাবি। একই ধরনের কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওও পাঠানো হয়।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, এরপর একটি বিকাশ নম্বরে এক লাখ টাকা পাঠাতে বলা হয়। টাকা না দিলে সাঈদকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁর বাবা জানিয়েছেন। তবে অর্থ দাবিকারীরা কারা, তারা কোথা থেকে যোগাযোগ করছে কিংবা ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিটি সত্যিই সাঈদ কি না—এসব বিষয়ে পরিবার নিশ্চিত নয়। পুলিশও এখন পর্যন্ত এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
সাঈদের বাবা বলেন, তাঁর একমাত্র চাওয়া ছেলেকে নিরাপদে ফিরে পাওয়া। অর্থ দাবির ঘটনায় তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এবং দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে ছেলেকে উদ্ধারের আশা করছেন।
অন্যদিকে তামিমের বাবা আবদুস সাত্তার জানান, এর আগেও তাঁর ছেলে মাদ্রাসা থেকে কাউকে না জানিয়ে দুইবার বাড়িতে চলে গিয়েছিল। পরে তিনি নিজে গিয়ে ছেলেকে মাদ্রাসায় দিয়ে আসেন। এবারও ছেলেকে না পাওয়ায় তিনি চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তবে এবার তামিমের সঙ্গে সাঈদও একই সময়ে মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
জাবালে নূর হাফিজিয়া মাদ্রাসার পরিচালক তোফায়েল আহমেদ বলেন, মঙ্গলবার ফজরের নামাজের সময় দুই শিক্ষার্থী মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যায়। বিষয়টি জানার পর তাদের অভিভাবকদের অবহিত করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তামিম এর আগে দুইবার মাদ্রাসা থেকে অনুমতি ছাড়াই বাড়িতে চলে গিয়েছিল। তবে এবার দুজন একসঙ্গে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানার পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও তাদের সন্ধানে তৎপর হয়।
ঘটনার পর দুই শিক্ষার্থীর পরিবার এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ শাহপরান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে। পুলিশও নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর ছবি বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছে।
শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আহমেদ বলেন, দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজের ঘটনায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকেরা জিডি করেছেন। তাদের সন্ধানে পুলিশ কাজ করছে এবং বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ছবি পাঠানো হয়েছে।
ইমোতে অর্থ দাবির বিষয়টি নিয়েও পুলিশ যাচাই করছে। ওসি জানান, অর্থ দাবির সঙ্গে যে নম্বরের কথা বলা হয়েছে, সেটি যাচাই করে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতারক চক্র সুযোগ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ। একই সঙ্গে ইমোতে পাঠানো কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওটি অস্পষ্ট হওয়ায় ভিডিওর দৃশ্য দেখে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এদিকে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও একই ঘটনার বিষয়ে পরিবারের অভিযোগ এবং পুলিশের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অর্থ দাবির ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন এবং নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজের ঘটনায় পরিবারের উদ্বেগের পাশাপাশি অর্থ দাবির বিষয়টি নতুন করে রহস্য তৈরি করেছে। কারণ একদিকে দুই কিশোর শিক্ষার্থী মাদ্রাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ, অন্যদিকে কয়েক দিন পর তাদের একজনকে আটকে রেখে নির্যাতনের দৃশ্য দেখানোর দাবি করা হয়েছে। কিন্তু ভিডিওটির উৎস, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির পরিচয় এবং অর্থ দাবিকারীদের পরিচয়—কোনোটিই এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
এ ধরনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো ভিডিও বা বার্তার সত্যতা যাচাই না করে তা প্রচার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে নিখোঁজ কিশোরদের পরিচয় ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য যাচাই করা জরুরি।
এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, দ্রুত দুই শিক্ষার্থীর অবস্থান শনাক্ত করে তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি অর্থ দাবির পেছনে সত্যিই কোনো অপরাধী চক্র জড়িত কি না, নাকি নিখোঁজের সুযোগ নিয়ে কেউ প্রতারণার চেষ্টা করছে—তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং দুই শিক্ষার্থীর সন্ধানে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে নিখোঁজ দুই কিশোরের অবস্থান এবং অর্থ দাবির ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।


