প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ফলাফলের আনন্দ তখনও অনেকের চোখেমুখে। কেউ সদ্য পেরিয়েছে স্কুলজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ, কেউ আবার সামনে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় নিয়ে ভাবছে। এই তরুণদের সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পথচলার প্রস্তুতিতে উৎসাহ দিতে হবিগঞ্জে আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ সংবর্ধনা ও স্কলারশিপ প্রদান অনুষ্ঠান। এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ২৫০ কৃতি শিক্ষার্থীকে এ অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা, মেডেল, সনদ ও স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছে।
‘আজকের কৃতি শিক্ষার্থীই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাব, হবিগঞ্জের উদ্যোগে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষার বিষয় নির্বাচন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক সেশন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাব, হবিগঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মোহাম্মদ মোশাহিদ মজুমদার। প্রধান অতিথি ছিলেন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ড. জি. এম. সরফরাজ বর্তমানে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাপিয়া আক্তার, সমাজসেবক সৈয়দ মুশফিক আহমদ, হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল কাইয়ুম, শায়েস্তাগঞ্জ ইসলামী একাডেমী অ্যান্ড হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল হক এবং সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ কলেজ, হবিগঞ্জের উপাধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন রুমি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ কৃতি শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ভালো ফলাফল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন হলেও এটিই চূড়ান্ত সাফল্যের শেষ ধাপ নয়। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও দেশপ্রেমকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে থাকা কঠিন। প্রযুক্তির ব্যবহার, সময়োপযোগী দক্ষতা অর্জন এবং নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিকাশে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের সম্মিলিত ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
কৃতি শিক্ষার্থীদের সামনে ক্যারিয়ার নিয়ে বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা দেন ঢাকার বক্তা ও ক্যারিয়ার গাইড ইঞ্জিনিয়ার হাসান মাহমুদ। উচ্চশিক্ষার বিষয় বাছাই, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। ফলাফল পাওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীর সামনে যে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়—কোন বিষয়ে পড়বে, কোথায় পড়বে এবং ভবিষ্যতে কোন পেশায় যাবে—দিকনির্দেশনামূলক এই সেশনে সেসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও নিজেদের অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে গোল্ড মেডেল পাওয়া লাবিব আহমেদসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের সাফল্যের অভিজ্ঞতা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা জানান। পরে অতিথিদের হাতে কৃতি শিক্ষার্থীদের মেডেল, সনদ ও স্কলারশিপ তুলে দেওয়া হয়।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানো নয়; বরং তাদের সামনে ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের সম্ভাব্য পথগুলো সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা। একটি ভালো ফলাফল যেন শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সেই আত্মবিশ্বাসকে দক্ষতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে নজর কাড়ে হবিগঞ্জ শাহ পরান মডেল মাদ্রাসার ক্ষুদে শিক্ষার্থী হাফেজ উসমানের সংবর্ধনা। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৬ মাস ১৩ দিনে পবিত্র কোরআন মুখস্থ করায় তাকে উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাবের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। কৃতি শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার পাশাপাশি এই বিশেষ সম্মাননা অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ কলেজ, হবিগঞ্জের উপাধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন রুমি। এ ছাড়া বক্তব্য দেন উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাব, হবিগঞ্জের সহসভাপতি মোশাররফ আলম চৌধুরী, শায়েস্তাগঞ্জ শাখার সভাপতি আল-আমিন সাইফী, বাহুবল শাখার সভাপতি মিনজাব ছাহাম এবং হবিগঞ্জ সদর শাখার সদস্যসচিব লাবিব ইসলাম।
সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, বিজ্ঞানচর্চা ও নেতৃত্ব বিকাশের উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। শিক্ষক বাতায়নে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে সংগঠনটি প্রথম শ্রেণীর বিজ্ঞান ক্লাব হিসেবে সরকারি নিবন্ধন পাওয়ার কথা জানানো হয়।
কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও স্কলারশিপ প্রদানের উদ্যোগকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখছেন আয়োজকেরা। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মোহাম্মদ মোশাহিদ মজুমদার বলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ার সম্পর্কে সঠিক সময়ে বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা দেওয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের বিকাশে এ ধরনের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের কথা জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপের গুরুত্ব শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি স্বীকৃতি অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করে। বিশেষ করে মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষার নতুন পর্যায়ে যাওয়ার সময় পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে পাওয়া এমন উৎসাহ শিক্ষার্থীদের নিজেদের লক্ষ্য নির্ধারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ধারাবাহিক অধ্যয়ন, দক্ষতা অর্জন, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃতি শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাবের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ফলে এটি শুধু একটি পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান না হয়ে শিক্ষার্থী, পরিবার, শিক্ষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মিলনস্থলেও পরিণত হয়।
বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের সামনে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রতিযোগিতাও। তাই পরীক্ষায় ভালো ফলের পর পরবর্তী পথ ঠিক করার সময় শুধু প্রচলিত পেশার দিকে না তাকিয়ে নিজের সক্ষমতা, আগ্রহ ও পরিবর্তনশীল কর্মবাজারের প্রয়োজন বিবেচনা করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠানের ক্যারিয়ার গাইডলাইন সেশনে এই বিষয়গুলোই বিশেষভাবে সামনে আসে।
আয়োজনের শেষ পর্যায়ে অতিথি, শিক্ষক, আয়োজক ও কৃতি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে গ্রুপ ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। ২৫০ শিক্ষার্থীর হাতে স্কলারশিপ, মেডেল ও সনদ তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের অর্জনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলেও আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই স্বীকৃতি যেন এখানেই থেমে না থাকে। বরং আজকের এই সাফল্যকে ভিত্তি করে তারা আরও বড় স্বপ্ন দেখবে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করবে এবং ভবিষ্যতে নিজেদের পাশাপাশি সমাজ ও দেশের জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।


