প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে মাত্র সাত মাসের মতো আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার তরুণ মোহাম্মদ মতিউর রহমান। যাওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। প্রবাসে যাওয়ার প্রায় তিন মাস পর জন্ম নেয় তাঁদের ছেলে। কিন্তু সেই সন্তানকে একবারও কোলে নেওয়া হলো না মতিউরের। রিয়াদের একটি ভাড়া বাসায় রুমমেটদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
২৫ বছর বয়সী মতিউর রহমান সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের বাঘারপাড় গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি সৌদি আরবে যান। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, বিদেশে কাজ করে কিছুদিনের মধ্যেই সংসারের অভাব-অনটন কাটিয়ে উঠবেন। স্ত্রী ও সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানকে নিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্নও ছিল তাঁর। সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সৌদি আরব থেকে এলো তাঁর মৃত্যুর খবর।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রিয়াদের হারা এলাকার একটি বাসায় কয়েকজন প্রবাসীর সঙ্গে একটি কক্ষে থাকতেন মতিউর। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কক্ষে থাকা ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও তাঁর সঙ্গে রুমমেটদের বসবাসের বিষয়টি একাধিক সংবাদমাধ্যমে নিশ্চিতভাবে এসেছে। কয়েক দিন ধরে তাঁদের মধ্যে ঘুমানোর জায়গা ও রান্নাবান্না নিয়ে বিরোধ চলছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে সেই বিরোধ নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করে বলে পরিবার জানিয়েছে। মতিউরের ভাই সাইফুর রহমানের ভাষ্য, রান্না নিয়ে একই কক্ষে থাকা দুই ভাই নজরুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হয় এবং পরে ছুরিকাঘাত করা হলে তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। পরিবারের দাবি, গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে রুমমেটরা সেখান থেকে চলে যান। পরে ওই বাসায় থাকা কোম্পানীগঞ্জের আরেক ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাটি জানতে পারেন।
তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ, হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত এবং ঘটনার পর কীভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের তথ্য এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে রুমমেটদের সঙ্গে বিরোধ ও ছুরিকাঘাতের কথা বলা হলেও ঘটনার চূড়ান্ত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে মতিউরের পরিবারের পক্ষ থেকেও জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
মতিউরের মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন তাঁর স্ত্রী। স্বামীকে বিদায় জানানোর সময় তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। কয়েক মাস পর সন্তান জন্ম নিলেও সেই সন্তানের বাবাকে আর ঘরে ফিরতে দেখা হলো না। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর মতিউরের স্ত্রী বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
মতিউরের ভাই সাইফুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় তাঁর ভাই সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। বিদেশে যাওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন। মতিউরের প্রবাসজীবনও খুব দীর্ঘ হয়নি। কয়েক মাসের মধ্যেই পরিবারের জন্য উপার্জনের বদলে তাঁর মরদেহ দেশে ফেরানোর অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে স্বজনদের।
এই ঘটনায় সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, মতিউরের সন্তান এখনো এত ছোট যে বাবাকে চিনে ওঠার সুযোগই পায়নি। পরিবার যে মানুষটির উপার্জনের আশায় ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করেছিল, সেই মানুষটিই এখন পরিবারের কাছে কেবল স্মৃতি। প্রবাসে যাওয়ার পর সন্তান জন্ম নেওয়ার খবর হয়তো মতিউরের জীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত ছিল। কিন্তু সন্তানের মুখোমুখি হওয়ার আগেই তাঁর জীবন থেমে গেল।
প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে এমন ঘটনা পরিবারগুলোর জন্য শুধু একজন সদস্যকে হারানোর শোক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অনিশ্চয়তাও। বিদেশে যাওয়া একজন তরুণ সাধারণত নিজের পরিবারের পাশাপাশি বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও স্বপ্ন দেখেন। কর্মস্থল ও আবাসস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সামান্য বিরোধও কখনো কখনো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। মতিউরের মৃত্যুর ঘটনাটি সেই ঝুঁকির কথাই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সৌদি আরবে মতিউরের মরদেহ উদ্ধারের পর স্থানীয় পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। পরিবারের সদস্যরা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও চেয়েছেন তাঁরা।
এ ঘটনায় বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ ও আবাসন পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিদেশে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক একসঙ্গে ছোট কক্ষ ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন। সেখানে ব্যক্তিগত জায়গার সংকট, রান্নাবান্না, ঘুমানোর স্থান, ভাড়া ও অন্যান্য দৈনন্দিন বিষয় নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মতিউরের ক্ষেত্রে ঠিক কোন বিষয় থেকে বিরোধের সূত্রপাত এবং কীভাবে তা প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিল, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং সত্য উদঘাটিত হোক। যদি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই স্বজনদের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখার সুযোগ চান তাঁরা।
সিলেটের প্রত্যন্ত গ্রামের এক তরুণ যে স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। স্ত্রীকে রেখে যাওয়া সেই মানুষটি ফিরে আসছেন মরদেহ হয়ে; আর তাঁর ছোট্ট সন্তান বড় হবে বাবার স্মৃতি নিয়ে। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য যে প্রবাসযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল এক পরিবারের আজীবন বয়ে বেড়ানোর মতো এক গভীর শোকের কারণ।


