প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ জোট ব্রিকসে যোগ দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদের আবেদন করার পর থেকে ইসলামাবাদ বিভিন্ন সদস্য দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। কিন্তু জোটের সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বসম্মতির নীতি থাকায় ভারতের আপত্তি পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন ও রাশিয়ার মতো প্রভাবশালী সদস্যদের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকলেও নয়াদিল্লির বিরোধিতার কারণে এখনো ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য হতে পারেনি ইসলামাবাদ।
বর্তমানে ব্রিকসের পরিধি আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই জোট পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে জোটটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর ফলে ব্রিকস এখন শুধু কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির সহযোগিতামূলক প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতে ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী একটি জোট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় পাকিস্তানও জোটটির অংশ হতে আগ্রহী। দেশটির জন্য ব্রিকসের সদস্যপদ শুধু কূটনৈতিক মর্যাদার বিষয় নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণের বোঝা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতার মধ্যে থাকা পাকিস্তান বিকল্প অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অর্থায়নের পথ খুঁজছে। ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো সেই কৌশলেরই একটি অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও দেশটির এই আগ্রহের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও তা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ইসলামাবাদ বৈদেশিক বিনিয়োগ, নতুন বাজার এবং বহুমুখী অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে চাইছে। ব্রিকসের মতো বড় অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে জায়গা করে নিতে পারলে দেশটির জন্য নতুন সহযোগিতার দরজা খুলতে পারে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।
বিশেষ করে ব্রিকস-সমর্থিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাকিস্তান নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে প্রায় ৫৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের মূলধনী শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি ব্রিকসের অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। ইসলামাবাদের দৃষ্টিতে এই ব্যাংক ভবিষ্যতে অবকাঠামো, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রকল্পে অর্থায়নের একটি বিকল্প উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতার কারণে। অর্থনৈতিক সংকটের সময় আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার ও শর্ত যুক্ত থাকে। ফলে ইসলামাবাদ এখন অর্থায়নের উৎস যতটা সম্ভব বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। ব্রিকসের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলেরই অংশ।
পাকিস্তান প্রথম থেকেই সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, পাকিস্তান ব্রিকসে যোগ দিতে আগ্রহী। তখন ইসলামাবাদ দাবি করেছিল, ব্রিকসের অধিকাংশ সদস্য দেশের সঙ্গেই তাদের উষ্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন আদায়ের চেষ্টা শুরু করে পাকিস্তান।
এরপর রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার জন্যও পাকিস্তান সক্রিয় হয়। রাশিয়ায় নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ খালিদ জামালি জানিয়েছিলেন, সদস্যপদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে মস্কোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চালানো হয়েছে। চীনের সঙ্গেও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইসলামাবাদ আশা করেছিল, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন সদস্যপদের পথ সহজ করতে পারে।
কিন্তু ব্রিকসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোই পাকিস্তানের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করেছে। জোটের নতুন সদস্য গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন। অর্থাৎ একজন সদস্য রাষ্ট্রও আপত্তি জানালে নতুন কোনো দেশকে সদস্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিরোধ রয়েছে। কাশ্মীর ইস্যু, সীমান্ত উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে দুই দেশের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই অস্থির। ফলে পাকিস্তানের মতো একটি দেশকে ব্রিকসের সদস্য করার বিষয়ে ভারতের আপত্তি থাকা অপ্রত্যাশিত নয়। নয়াদিল্লির অবস্থানের কারণে চীন ও রাশিয়ার সমর্থন থাকলেও ইসলামাবাদের সদস্যপদের প্রক্রিয়া এগোতে পারছে না।
এখানেই পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করে ব্রিকসের ভেতরে সমর্থন বাড়াতে চাইছে ইসলামাবাদ, অন্যদিকে ভারতের আপত্তি কাটিয়ে উঠতে হচ্ছে। কিন্তু ব্রিকসের বর্তমান সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামোয় কোনো একটি সদস্যের আপত্তিকে পাশ কাটিয়ে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ সীমিত। ফলে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও সদস্যপদের বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।
তবে পাকিস্তানের ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আগ্রহকে শুধু ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টির অর্থনৈতিক দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। ইসলামাবাদের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব মূলত একটি বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের অংশ হওয়ার সুযোগে। বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ, উন্নয়ন অর্থায়ন পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের কণ্ঠ আরও জোরালো করার ক্ষেত্রে জোটটি পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে ব্রিকসও বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। সদস্য সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোটের ভেতরে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থও বাড়ছে। ফলে নতুন সদস্য গ্রহণের প্রশ্নে ঐকমত্য তৈরি করা আগের তুলনায় আরও জটিল হতে পারে। পাকিস্তানের আবেদন সেই বৃহত্তর বাস্তবতার মধ্যেই বিবেচিত হবে।
বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার জন্য মোট ২৯টি দেশ আবেদন করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানও রয়েছে। ফলে ইসলামাবাদের সামনে প্রতিযোগিতাও কম নয়। ব্রিকস ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিলে কোন দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বিবেচনায় আসতে পারে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের ব্রিকস সদস্যপদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেশটির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে বিনিয়োগ এবং অন্যান্য সদস্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছুর মধ্য দিয়ে ইসলামাবাদ নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভারতের আপত্তি এবং ব্রিকসের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতি এখনো সবচেয়ে বড় বাধা।
পাকিস্তানের সামনে তাই প্রশ্ন শুধু ব্রিকসে যোগ দেওয়ার নয়; বরং কীভাবে ভারতীয় আপত্তি মোকাবিলা করে জোটের ভেতরে প্রয়োজনীয় ঐকমত্য তৈরি করা যায়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে বিকল্প সহযোগিতার সন্ধানে থাকা ইসলামাবাদের জন্য ব্রিকসের দরজা খুলবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী দিনের কূটনৈতিক সমীকরণ ও সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।


