প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত বুকাভু শহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর স্কুল থেকে বের হওয়ার সময় সৃষ্ট পদদলনে অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই শিশু ও শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। অগ্নিকাণ্ডে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের কয়েক শ কাঠের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৯ জন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দক্ষিণ কিভু প্রদেশের রাজধানী বুকাভুর চিমপুন্ডা এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে একটি বসতিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। শুষ্ক পরিবেশ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কারণে আগুন দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আগুনের শিখা ও ধোঁয়া দুটি স্কুলের দিকেও পৌঁছে যায়। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন প্রথমে একটি বসতিতে ছড়িয়ে পড়লেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুল ভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে। একই সময়ে চারদিকে ধোঁয়া ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় নিরাপদে বের হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। একপর্যায়ে সেই বিশৃঙ্খলা ভয়াবহ পদদলনের রূপ নেয়।
স্থানীয় কর্মকর্তা প্যাট্রিস বুদুগে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে বের হওয়ার সময় একে অপরের ওপর পড়ে যান। আতঙ্কিত অনেকে স্বাভাবিক পথের পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরে তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
অগ্নিকাণ্ডে উজামা প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ফুরাহা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্কুল দুটির পাশাপাশি আশপাশের একটি বসতিও আগুনে পুড়ে যায়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০টি কাঠের ঘর আগুনে ধ্বংস হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে বহু পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এএফসি/এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মুখপাত্র লরেন্স কানিউকার দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে ১৯ জন মেয়ে ও পাঁচজন ছেলে রয়েছে। অন্য নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে নিহতের সংখ্যা এবং পরিচয়ের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় একটি ক্লিনিকের নার্স ক্রিস্টোফ জিগাশানে জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার জন্য ওই ক্লিনিকে আনা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষকও ছিলেন। আগুনের ধোঁয়ার কারণে অনেকেই শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। কয়েকজনকে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
কানিউকার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আহত ২৯ জনকে বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে ২১ জনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। গুরুতর আহতদের মধ্যে ১৭ জন কাদুতু জেনারেল হাসপাতালে এবং চারজন বুকাভু প্রভিন্সিয়াল জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের জন্যও পরিস্থিতিটি ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, কারণ একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক আহত শিক্ষার্থীকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দেয় এলাকাটির কাঠের ঘরগুলো। দক্ষিণ কিভু প্রদেশের উপগভর্নর দুনিয়া মাসুমবুকো বুয়েঙ্গের তথ্য অনুযায়ী, আগুনে প্রায় ৩০০টি কাঠের ঘর পুড়ে গেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কাঠের তৈরি ঘর বেশি থাকায় আগুন দ্রুত এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী হারিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবাদানকারী দল ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
তবে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃতের সংখ্যা চূড়ান্ত নয়। ফলে উদ্ধারকাজ ও চিকিৎসা কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগুন লাগার কারণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা থাকলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো নির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করা হয়নি।
বুকাভুতে সাম্প্রতিক সময়েও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এর মাত্র কয়েক দিন আগে একটি আগুনে ৪৫টির বেশি ঘর পুড়ে যায়। তবে ওই অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে বৃহস্পতিবারের ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।
এই অগ্নিকাণ্ড এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বুকাভু দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর বুকাভু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রুয়ান্ডার সমর্থনপুষ্ট এএফসি/এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের লক্ষ্যে গোষ্ঠীটির সামরিক তৎপরতা বাড়ার পর শহরটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তিত হয়।
দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে পূর্ব ডিআর কঙ্গোর সাধারণ মানুষ নানা ধরনের নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়ে আসছেন। বাস্তুচ্যুতি, ঘরবাড়ি হারানো এবং মৌলিক সেবার সংকটের পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। বুকাভুর সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই সংকটের মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে স্কুলে থাকা শিশুদের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। যে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের মতো পড়াশোনার জন্য স্কুলে গিয়েছিল, আগুন ও আতঙ্কের মধ্যে তাদের অনেকেই আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। অভিভাবকদের জন্যও এই ঘটনা গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার পর উদ্ধারকাজ, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে স্কুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত নিরাপদে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেটিও সামনে এসেছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মানবিক ও জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রয়োজন মেটানো কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের জন্য আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা জরুরি হয়ে উঠেছে।
এদিকে আগুনের প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং পদদলনে এত প্রাণহানির পেছনে কী পরিস্থিতি কাজ করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে তদন্তের দিকে তাকিয়ে আছে স্থানীয় মানুষ। নিহত ও আহতদের প্রকৃত সংখ্যা এবং পরিচয়ও তদন্ত ও উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর আরও স্পষ্ট হতে পারে।
বুকাভুর এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, সংঘাত ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জন্য একটি দুর্ঘটনাও কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্গঠন এবং আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি নিহত শিশুদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় মানবিক দায়িত্ব।


