প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৬। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় ভোরে দেশটির উত্তর-পূর্ব জাভা প্রদেশের তেলুকনাগার কাছে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ২৩ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৩৫৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার গভীরে। এত গভীরে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হওয়ায় এর কম্পন বিস্তৃত এলাকায় অনুভূত হয়ে থাকতে পারে বলে ভূমিকম্প-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে সাধারণত দেখা যায়।
ভূমিকম্পের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জাভা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়। ভোরের দিকে যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন হঠাৎ কম্পন অনুভূত হওয়ায় অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পটির কারণে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ভূমিকম্পের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাধারণত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ, ভবন ও অবকাঠামোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য পরবর্তী কম্পনের বিষয়ে সতর্কতা জারি করে থাকে। এ ক্ষেত্রেও স্থানীয় পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর কখনো কখনো পরবর্তী ছোট বা মাঝারি মাত্রার কম্পন অনুভূত হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম তুলনামূলক বেশি। প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে বিস্তৃত এই ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক সংঘর্ষ ও নড়াচড়া ঘটে। এর ফলে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায়ই ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
জাভা ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ দ্বীপ। দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনজীবনের বড় একটি অংশ এই দ্বীপকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। ফলে জাভা অঞ্চলে মাঝারি বা শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প হলে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ভবন, সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে এবারের ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর গভীরতা। ইউএসজিএসের হিসাবে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার নিচে। অগভীর ভূমিকম্পের তুলনায় গভীর ভূমিকম্পের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের হতে পারে। ভূমিকম্পের মাত্রা ছাড়াও এর গভীরতা, উৎপত্তিস্থল থেকে জনবসতির দূরত্ব এবং স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৬ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পকে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে শুধু মাত্রার ওপর ভিত্তি করে কোনো ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা যায় না। একই মাত্রার ভূমিকম্প ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কোথাও বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতি হতে পারে, আবার কোথাও তুলনামূলক কম ক্ষতি হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মানুষ ভূমিকম্পের সঙ্গে অনেকটাই পরিচিত হলেও প্রতিটি শক্তিশালী কম্পন নতুন করে সতর্কতার প্রয়োজন তৈরি করে। বিশেষ করে স্কুল, হাসপাতাল, আবাসিক ভবন, সেতু এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভূমিকম্প সহনশীল কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় মানুষের আতঙ্কিত হয়ে হঠাৎ দৌড়াদৌড়ি করাও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত ভূমিকম্পের সময় শান্ত থাকার এবং নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ভবনের ভেতরে থাকলে জানালা, কাচ বা ভারী আসবাব থেকে দূরে থাকা এবং মাথা সুরক্ষিত রাখার মতো মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে অপ্রয়োজনে প্রবেশ না করাও জরুরি।
এদিকে জাভা অঞ্চলে সর্বশেষ ভূমিকম্পের পর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ভূমিকম্পের পরপরই ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। প্রত্যন্ত এলাকা, যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যা কিংবা বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কে বিঘ্নের কারণে তথ্য সংগ্রহে সময় লাগতে পারে। তাই প্রাথমিকভাবে কোনো বড় ক্ষতির খবর না পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র সামনে আসতে পারে।
ভূমিকম্পের সময় ও উৎপত্তিস্থল নিয়ে ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোরে উত্তর-পূর্ব জাভা প্রদেশের তেলুকনাগার কাছাকাছি এলাকায় কম্পনটি সৃষ্টি হয়। গভীরতা ছিল প্রায় ৩৫৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার। ভূমিকম্পটির এই গভীরতা এবং উৎপত্তিস্থলের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছে।
ইন্দোনেশিয়ায় এমন ভূমিকম্প নতুন নয়। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানই একে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রেখেছে। অতীতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পাশাপাশি সুনামি ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতও দেশটির মানুষের জন্য বড় ধরনের দুর্যোগ বয়ে এনেছে। তাই নতুন করে শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোও ফিরে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে এর ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ, পুরোনো স্থাপনার নিরাপত্তা যাচাই, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি থাকলে বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
জাভা অঞ্চলে অনুভূত ৬ দশমিক ৬ মাত্রার এই ভূমিকম্পও তাই নতুন করে দুর্যোগ প্রস্তুতির গুরুত্ব সামনে এনেছে। যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। ভূমিকম্পের পরবর্তী কম্পন বা স্থানীয়ভাবে কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়েও নজর রাখা জরুরি।
সবশেষ পাওয়া তথ্যে, শুক্রবার ভোরে ইন্দোনেশিয়ার উত্তর-পূর্ব জাভা অঞ্চলে শক্তিশালী এই ভূমিকম্প অনুভূত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত হয়নি। তবে দেশটির ভূমিকম্পপ্রবণ অবস্থানের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


