প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
অনূর্ধ্ব-২০ নারী এশিয়া কাপ হকির চ্যালেঞ্জার পুলে দুর্দান্ত জয় দিয়ে নিজেদের অভিযান শুরু করেছে বাংলাদেশ। উদ্বোধনী ম্যাচে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ৭-০ গোলের বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। হুলুনবুইর সিটিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক হকি খেললেও প্রথম কোয়ার্টারে গোলের দেখা পায়নি বাংলাদেশ। তবে দ্বিতীয় কোয়ার্টারে গোলের খাতা খোলার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি দলটিকে।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল এবং আক্রমণের ধার দিয়ে চাইনিজ তাইপেকে চাপে রাখে বাংলাদেশের মেয়েরা। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুললেও প্রথম কোয়ার্টারে কাঙ্ক্ষিত গোলটি আসেনি। গোলশূন্য প্রথম ১৫ মিনিটে বাংলাদেশের আধিপত্য স্পষ্ট থাকলেও ফিনিশিংয়ের অভাবে ব্যবধান তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
দ্বিতীয় কোয়ার্টারে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। কর্নার ফিল্ড থেকে গোল করে বাংলাদেশকে এগিয়ে দেন কনা আক্তার। তার গোলে ম্যাচে স্বস্তি ফিরে আসে বাংলাদেশ শিবিরে। গোল পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায় খেলোয়াড়দের। আক্রমণের গতি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ আরও তীব্র করে বাংলাদেশ।
চাইনিজ তাইপে গোল পরিশোধের চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের সংগঠিত রক্ষণ ও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ তাদের সেই সুযোগ খুব বেশি দেয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডরা প্রতিপক্ষের বৃত্তে বারবার প্রবেশ করে গোলের সুযোগ তৈরি করতে থাকেন। প্রথম গোলের পর থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কার্যত নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় বাংলাদেশ।
তৃতীয় কোয়ার্টারে বাংলাদেশের আক্রমণ যেন আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এই ১৫ মিনিটেই প্রতিপক্ষের জালে চারবার বল পাঠায় লাল-সবুজের দল। দ্রুত পাস, আক্রমণের বৈচিত্র্য এবং গোলমুখে নিখুঁত সমন্বয়ে চাইনিজ তাইপের রক্ষণভাগকে একের পর এক পরীক্ষায় ফেলেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা। তৃতীয় কোয়ার্টার শেষ হওয়ার আগেই বড় ব্যবধান তৈরি করে বাংলাদেশ নিজেদের জয় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলে।
গোলের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসও বাড়তে থাকে। প্রতিপক্ষের ওপর চাপ ধরে রেখে তারা আক্রমণ চালিয়ে যায়। চাইনিজ তাইপের খেলোয়াড়রা মাঝেমধ্যে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের রক্ষণভাগ তা সামলে নেয়। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়নি।
শেষ কোয়ার্টারেও আক্রমণের তীব্রতা কমায়নি বাংলাদেশ। বরং পেনাল্টি কর্নারকে কাজে লাগিয়ে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেন অধিনায়ক রিমন সারিকা। শেষ কোয়ার্টারে তার স্টিক থেকে আসে দুটি গোল। অধিনায়কের এই পারফরম্যান্স দলকে শুধু বড় জয়ই এনে দেয়নি, ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশের আক্রমণাত্মক মানসিকতারও প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
পুরো ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে জোড়া গোল করেছেন অধিনায়ক রিমন সারিকা, এমা নাদিরা ও আইরিন রিয়া। একটি গোল করেছেন কনা আক্তার। অর্থাৎ দলের আক্রমণভাগে একাধিক খেলোয়াড়ের কার্যকর অবদান ছিল। একক কোনো খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর না করে দলীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে গোলগুলো এসেছে—যা পরবর্তী ম্যাচগুলোর জন্য বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৭-০ গোলের জয় শুধু পয়েন্টের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের দিক থেকেও বাংলাদেশের জন্য বড় প্রাপ্তি। বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বড় জয় খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি পরবর্তী ম্যাচে আরও সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে মাঠে নামার সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে টুর্নামেন্টের শুরুতেই গোল ব্যবধানের এমন জয় দলটির আত্মবিশ্বাসকে আরও উজ্জীবিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের সামনে এখন আরও কঠিন পরীক্ষা। নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে রোববার পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে দলটি। প্রথম ম্যাচের ফল বিবেচনায় এই ম্যাচের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। কারণ পাকিস্তান নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে হংকং চায়নার কাছে ২-০ গোলে হেরে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। ফলে বাংলাদেশ যেখানে বড় জয় দিয়ে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে, সেখানে পাকিস্তান প্রথম ম্যাচের ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে।
বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তান ম্যাচটি তাই চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে পাওয়া সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পরীক্ষা। প্রথম ম্যাচে সাত গোল করার পরও দলের সামনে নতুন করে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ থাকবে। প্রতিপক্ষের শক্তি, খেলার ধরন এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি মনোযোগ ও শৃঙ্খলা প্রয়োজন হবে।
চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল গোল করার সক্ষমতা। প্রথম কোয়ার্টারে গোল না পেলেও দলটি হতাশ হয়নি। বরং ধৈর্য ধরে আক্রমণ চালিয়ে গেছে এবং পরবর্তী তিন কোয়ার্টারে নিজেদের সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় এমন ধৈর্য এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা একটি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল আদায়ের দক্ষতাও বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কনা আক্তারের গোল দিয়ে শুরু এবং শেষ কোয়ার্টারে অধিনায়ক রিমন সারিকার দুটি পেনাল্টি কর্নার গোল বাংলাদেশের সেট-পিস আক্রমণের কার্যকারিতা তুলে ধরেছে। পরবর্তী ম্যাচগুলোতেও এমন সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের আক্রমণ আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের নারী হকিতে বয়সভিত্তিক দলগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ অভিজ্ঞতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এ ধরনের টুর্নামেন্টে শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে খেলে খেলোয়াড়েরা আন্তর্জাতিক মানের গতি, শারীরিক সক্ষমতা, কৌশল ও চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাই এবারের অনূর্ধ্ব-২০ নারী এশিয়া কাপ শুধু ফলাফলের দিক থেকেই নয়, ভবিষ্যতের জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ।
চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ৭-০ গোলের জয় বাংলাদেশের মেয়েদের সেই সম্ভাবনারই একটি উজ্জ্বল সূচনা করেছে। তবে টুর্নামেন্টের পথ এখনও দীর্ঘ। একটি বড় জয় দলকে আত্মবিশ্বাস দিতে পারে, কিন্তু পরবর্তী ম্যাচগুলোতে একই মাত্রার মনোযোগ, পরিশ্রম এবং দলীয় সমন্বয় ধরে রাখাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
রোববার পাকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামার সময় বাংলাদেশের মেয়েদের সামনে তাই একদিকে থাকবে প্রথম ম্যাচের সাফল্যের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে থাকবে প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে না নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। পাকিস্তানও প্রথম ম্যাচে হারের পর ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া থাকবে। ফলে দ্বিতীয় ম্যাচটি দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে বাংলাদেশের মেয়েদের ৭-০ গোলের জয় দেশের নারী হকিতে আশাবাদের নতুন উপলক্ষ তৈরি করেছে। বড় ব্যবধানে পাওয়া এই জয় যেমন টুর্নামেন্টের শুরুটা রাঙিয়েছে, তেমনি পরবর্তী ম্যাচগুলোতে আরও ভালো কিছু করার প্রত্যাশাও বাড়িয়েছে। এখন সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।


