প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সিলেট নগরের রায়নগরে আলোচিত ট্রিপল মার্ডার মামলার তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআইয়ের কাছে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের আশ্বাস ও নির্দেশনার পর নিহত দম্পতির সন্তান ও স্বজনদের মধ্যে নতুন করে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে শুক্রবার পর্যন্ত মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।
গত ১ সেপ্টেম্বর সিলেট সফরকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নিহত এমএ সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের দুই মেয়ে সেলিনা সুলতানা শিখা ও তারানা সুলতানা শিমু। এ সময় তারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন তদন্তের দাবি জানান। মন্ত্রী তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নিহতদের স্বজনেরা তদন্তের অগ্রগতি এবং মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করে তার জবানবন্দি নেওয়া হলেও সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভাতেও আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ ওঠে। সূত্র জানায়, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নজরে আনেন। সেখানে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীমের কাছ থেকে মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হন মন্ত্রী। পরে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
এরপর ঢাকায় ফেরার পথেও বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ মহাপরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলে মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন আশ্বাসের পর নিহত সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির সন্তানরা নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। গত ২ সেপ্টেম্বর সিলেটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনেও তারা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তাদের বক্তব্য, তারা এমন একটি তদন্ত চান যেখানে কোনো পক্ষের প্রভাব বা চাপ থাকবে না এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে।
তবে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। শুক্রবার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো. সাইফুল ইসলামও জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি এখনো কিছু জানেন না। ফলে তদন্তভার হস্তান্তরের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
এর আগে ১২ আগস্ট সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন ব্যবসায়ী এমএ সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তাদের গৃহকর্মী। হত্যাকাণ্ডের ধরন ও একই বাসায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় শুরু থেকেই এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং তদন্ত শুরু করে।
প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়। বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা অবস্থায় পাওয়ার তথ্যও সামনে আসে। শুরুতে পুলিশের তদন্তে চুরি বা ডাকাতির সম্ভাবনাসহ একাধিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। পাশাপাশি পারিবারিক বা সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছিল।
ঘটনার পর রঙ মিস্ত্রি বাবুল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতে দেওয়া তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে টাকার জন্য চুরি করতে গিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কথা উঠে আসে বলে জানা যায়। তবে নিহতদের স্বজনরা তার এই বক্তব্য নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু চুরির উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা আরও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে সম্পত্তি ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের সম্ভাবনাও সামনে আনা হয়েছে। নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা থানায় দেওয়া অভিযোগেও এ ধরনের বিষয় উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, তাদের বাবা-মা দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশে বসবাস করতেন। ফলে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল, সেটি উদ্ঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি।
তদন্তের ক্ষেত্রে পরিবারের এই দাবিকে সরাসরি সত্য বা চূড়ান্ত কারণ হিসেবে দেখছে না পুলিশ। বরং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য সাক্ষ্য, আলামত, ফরেনসিক তথ্য, আসামির বক্তব্য এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্য যাচাই করাই তদন্তের মূল বিষয়। ফলে পিবিআই দায়িত্ব পেলে তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হয় কি না এবং নতুন কোনো তথ্য সামনে আসে কি না, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই নিহতদের সন্তানরা দেশে-বিদেশে থাকা অবস্থায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। চার সন্তানের মধ্যে কয়েকজন বিদেশে থাকেন। বাবা-মাকে হারানোর পাশাপাশি তাদের কাছে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের প্রশ্নটিও বড় হয়ে উঠেছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, তারা প্রতিশোধ নয়, বরং সত্য উদ্ঘাটন এবং আইনের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচার চান।
একটি পরিবারের তিন সদস্যকে একই ঘটনায় হারানোর এই ঘটনা সিলেটের মানুষের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নিজ বাসায় একজন প্রবীণ দম্পতি ও তাদের গৃহকর্মীর হত্যাকাণ্ড নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ঘটনার পর তদন্তের অগ্রগতি এবং অপরাধের প্রকৃত কারণ জানার অপেক্ষায় রয়েছে নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় মানুষ।
এদিকে তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইয়ের হাতে গেলে মামলার বিভিন্ন দিক নতুন করে যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তদন্তের ফলাফল না আসা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা সমীচীন নয়। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির আদালতে দেওয়া বক্তব্যও তদন্তের অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পর নিহত পরিবারের প্রত্যাশা এখন আরও বেড়েছে। তারা আশা করছেন, তদন্তে যদি কোনো প্রভাব বা বিভ্রান্তি থেকে থাকে, তা দূর করে প্রকৃত সত্য সামনে আনা হবে। একই সঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলার আনুষ্ঠানিক তদন্তভার হস্তান্তর এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার ও নগরবাসী।
রায়নগরের এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস পর তদন্ত কোন পথে এগোয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পিবিআইয়ের কাছে তদন্তভার হস্তান্তর চূড়ান্ত হলে তদন্তে নতুন কোনো তথ্য, আলামত বা সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার সূত্র বেরিয়ে আসে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে নিহতদের স্বজনদের প্রত্যাশা একটাই—তিনটি প্রাণহানির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হোক এবং যারা দায়ী, প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।


