প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
ম্যাকাইয়ের দ্য গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টের প্রথম দিনটি বাংলাদেশের জন্য ছিল নাটকীয়তায় ভরা। সকালে ব্যাট হাতে চরম বিপর্যয়, মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর যে দলটি ম্যাচ থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়েছিল, দিনের শেষভাগে বল হাতে সেই দলই ফিরেছে দুর্দান্তভাবে। বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলামের অসাধারণ বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপও একসময় চাপে পড়ে যায়। দিন শেষে স্বাগতিকদের স্কোর ৮ উইকেটে ১৬৫ রান। ফলে প্রথম ইনিংসের হিসাবে অস্ট্রেলিয়া এগিয়ে আছে ১০১ রানে।
প্রথম দিনেই দুই দলের মোট ১৮টি উইকেট পড়েছে। বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতার পর অস্ট্রেলিয়াও পুরোপুরি স্বস্তিতে দিন শেষ করতে পারেনি। ক্যামেরন গ্রিন ৮১ বলে ৫১ রান করে অপরাজিত রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে ১০ রান নিয়ে অপরাজিত আছেন নাথান লায়ন। অস্ট্রেলিয়ার হাতে আর মাত্র দুই উইকেট থাকায় দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই বাংলাদেশ দ্রুত সেই উইকেট দুটি তুলে নিতে পারলে ম্যাচের পরিস্থিতি আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
টসে হেরে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ শুরু থেকেই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ম্যাচের প্রথম বলেই সাদমান ইসলামকে সাজঘরে ফেরান অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্ক। শুরুতেই বড় ধাক্কা খাওয়া বাংলাদেশ আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়নি। তানজিদ হাসান, নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হকও দ্রুত ফিরে গেলে প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের টপ অর্ডার কার্যত ধসে পড়ে।
স্টার্কের আগুনঝরা স্পেলের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটাররা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। মাত্র ২২ বলের ব্যবধানে পাঁচটি উইকেট তুলে নিয়ে তিনি বাংলাদেশের ইনিংসকে এমন অবস্থায় নিয়ে যান, যেখান থেকে দলটির টেস্ট ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্কোরের শঙ্কা তৈরি হয়। একপর্যায়ে ১২ রানেই পাঁচ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ সেই লজ্জার রেকর্ডের কাছাকাছি চলে যায়।
এর আগে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বনিম্ন দলীয় স্কোর ৪৩ রান। মাত্র ১২ রানে পাঁচ উইকেট হারানোর পর মনে হচ্ছিল, সেই রেকর্ডও হয়তো অক্ষত থাকবে না। কিন্তু পরের দিকে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে ওঠায় পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সামাল দেয় সফরকারীরা।
মুশফিকুর রহিম ও মেহেদী হাসান মিরাজ কিছুটা সময় উইকেটে থাকার চেষ্টা করেন। মুশফিক পাঁচ রান এবং মিরাজ ১১ রান করেন। তবে বড় জুটি গড়ার আগেই দুজনও ফিরে যান। এরপর বাংলাদেশের ইনিংস আরও দ্রুত গুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
শেষদিকে তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ২৫ রানের জুটি গড়ে দলের স্কোর কিছুটা বাড়িয়ে দেন। তাদের এই প্রতিরোধই বাংলাদেশকে নিজেদের সর্বনিম্ন দলীয় স্কোরের লজ্জা থেকে রক্ষা করে। শেষ পর্যন্ত ৬৪ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে স্টার্ক ছিলেন সবচেয়ে সফল বোলার। মাত্র ১২ রান খরচ করে তিনি তুলে নেন ছয়টি উইকেট। তাঁর সঙ্গে প্যাট কামিন্স ২৫ রানে তিনটি এবং জশ হ্যাজলউড একটি উইকেট নেন। বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের বিপর্যয়ের পেছনে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের ব্যাটাররা যখন ব্যর্থতার ভারে ম্যাচকে প্রায় অস্ট্রেলিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তখন বল হাতে দায়িত্ব নেন শরিফুল ইসলাম। বাংলাদেশের বোলিং ইনিংসের শুরু থেকেই তাঁর শরীরী ভাষায় ছিল আত্মবিশ্বাস। তাসকিন আহমেদ প্রথম ধাক্কা দিয়ে ম্যাট রেনশকে আট রানে ফেরানোর পর শরিফুল অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন।
মার্নাস লাবুশেন ও ট্রাভিস হেডকে একই ওভারে সাজঘরে পাঠিয়ে ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেন শরিফুল। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে পরপর আঘাত আসায় স্বাগতিকদের ইনিংসেও অস্থিরতা তৈরি হয়।
তবে স্টিভ স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিনের ব্যাটে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পায় অস্ট্রেলিয়া। দুজন মিলে ৭৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে দলকে বিপদ থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। স্মিথ ৪২ রান করেন। গ্রিনও ধীরে ধীরে নিজের ইনিংসকে বড় করার দিকে এগিয়ে যান।
বাংলাদেশের জন্য আবারও শঙ্কা তৈরি হচ্ছিল, অস্ট্রেলিয়া হয়তো বড় লিড নিয়ে প্রথম দিন শেষ করবে। কিন্তু চা বিরতির পর শরিফুল আবারও আক্রমণে ফিরে আসেন। এবার তাঁর শিকার হন স্মিথ, বো ওয়েবস্টার এবং অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে তিনি স্বাগতিকদের বড় স্কোরের আশা নষ্ট করে দেন।
শরিফুলের বোলিংয়ে সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়া। ইনিংসের শেষ ওভারে মিচেল স্টার্ককে ফেরানোর মধ্য দিয়ে তিনি নিজের ষষ্ঠ উইকেট তুলে নেন। ফলে অস্ট্রেলিয়া আট উইকেটে ১৬৫ রানে দিন শেষ করতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশের জন্য দিনের প্রথম সেশন ছিল হতাশার, কিন্তু শেষ সেশন এনে দিয়েছে আশার আলো। মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পরও দিনের শেষে অস্ট্রেলিয়াকে ২০০ রানের নিচে আটকে রাখা নিঃসন্দেহে সফরকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বিশেষ করে দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার শেষ দুই উইকেট তুলে নিতে পারলে ম্যাচের ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে আনার সুযোগ থাকবে বাংলাদেশের সামনে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার হাতে এখনো দুই উইকেট রয়েছে এবং ক্যামেরন গ্রিন ক্রিজে সেট হয়ে আছেন। তাই বাংলাদেশের জন্য নতুন দিনের প্রথম লক্ষ্য হবে দ্রুত গ্রিন ও লায়নকে ফেরানো। অস্ট্রেলিয়া যত বেশি রান যোগ করতে পারবে, বাংলাদেশের ওপর চাপ তত বাড়বে।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতা অবশ্য দলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে। টেস্ট ক্রিকেটে ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পর প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সবসময়ই কঠিন। তবে শরিফুলের বোলিং বাংলাদেশকে সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তাঁর পাশাপাশি তাসকিনের শুরুতে পাওয়া উইকেটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ম্যাচের প্রথম দিনটি তাই দুই বিপরীত চিত্রের গল্প হয়ে থাকল। একদিকে স্টার্কের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটারদের অসহায় আত্মসমর্পণ, অন্যদিকে শরিফুলের আগ্রাসী বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ওপর পাল্টা চাপ। দিনের শুরুতে বাংলাদেশের জন্য যে ম্যাচটি একতরফা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল, দিনের শেষে সেটিই আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস দ্রুত শেষ করা এবং নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স করা। প্রথম ইনিংসের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যাটাররা যদি উইকেটে সময় কাটাতে পারেন, তাহলে শরিফুলের তৈরি করা সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
ম্যাকাইয়ের উইকেটে প্রথম দিনের নাটকীয়তা তাই ম্যাচের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। অস্ট্রেলিয়া এখনো এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের বোলাররা দেখিয়ে দিয়েছেন, ম্যাচ পুরোপুরি হাতছাড়া হয়নি। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার শেষ দুই উইকেট দ্রুত তুলে নিতে পারলে এবং এরপর ব্যাট হাতে বড় জুটি গড়তে পারলে এই ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সুযোগ থাকবে বাংলাদেশের।


