সবুজ জাহাজভাঙা শিল্পে পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস বাণিজ্যমন্ত্রীর

প্রকাশ:৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পকে আরও পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সরকারের লক্ষ্য দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে পরিবেশবান্ধব বা ‘সবুজ কারখানার’ সংখ্যা বর্তমান পর্যায় থেকে বাড়িয়ে তিন অঙ্কে নিয়ে যাওয়া।

সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা আইএমও আয়োজিত এক সেমিনারে জাহাজভাঙা শিল্পের সম্ভাবনা, ব্যয়, চ্যালেঞ্জ এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই শিল্পকে আধুনিক ও পরিবেশসম্মত কাঠামোয় নিয়ে যেতে সরকার কাজ করছে।

তিনি জানান, দেশে বর্তমানে জাহাজভাঙা শিল্পে সবুজ কারখানার সংখ্যা ৩১টি। আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা মান অনুসরণ করে পরিচালিত এসব কারখানার সংখ্যা আরও বাড়ানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা তিন ডিজিটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। পুরোনো ও ব্যবহার অযোগ্য জাহাজ ভেঙে পাওয়া ইস্পাতসহ বিভিন্ন উপকরণ দেশের শিল্প ও নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত হয়। এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানও জড়িত। তবে অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।

পুরোনো জাহাজে থাকা বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতু, রাসায়নিক পদার্থ, তেলজাতীয় বর্জ্য এবং অন্যান্য বিপজ্জনক উপকরণ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হলে তা মাটি, পানি ও বায়ুর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণেই জাহাজভাঙা শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী ক্ষতিকর রাসায়নিক ও বিপজ্জনক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, দূষণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি বা টিএসডিএসের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন বিপজ্জনক বর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত এবং শেষ পর্যন্ত পরিবেশসম্মত উপায়ে অপসারণের জন্য এ ধরনের বিশেষায়িত অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশেষ বর্জ্য শোধনাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ পর্যালোচনা করছে শিল্প মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জাহাজভাঙা শিল্পসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

আইএমওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ বাংলাদেশে সম্পন্ন হয়েছে। এই তথ্য দেশের জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশ্বের পুরোনো জাহাজ পুনর্ব্যবহারের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলে সম্পন্ন হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিবেশ, শ্রম ও নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু কতগুলো জাহাজ পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং কীভাবে নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে এ কাজ করা হচ্ছে, সেটিও আন্তর্জাতিক বাজারে শিল্পটির গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে।

জাহাজের ভেতরে থাকা বিপজ্জনক উপাদানগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা না হলে তা পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। ভারী ধাতু ও রাসায়নিক বর্জ্য মাটিতে মিশে গেলে কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে পানি ও উপকূলীয় পরিবেশ দূষিত হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এ বাস্তবতায় দেশের জাহাজভাঙা শিল্পকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের জাহাজভাঙা শিল্পসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানার বিষাক্ত ও বিপজ্জনক বর্জ্য নিরাপদে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য বিশেষায়িত ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি বা টিএসডিএফ গড়ে তোলার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

এই প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারি তহবিলের পাশাপাশি ওডিএ ঋণ এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলে অর্থায়নের প্রস্তাবও রয়েছে।

পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মানদণ্ড বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশ্বব্যাপী শিল্প উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহার খাতে পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশের শিল্পগুলোকে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

সবুজ কারখানার সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা এ পরিবর্তনেরই একটি অংশ। বর্তমানে ৩১টি সবুজ কারখানা থেকে ভবিষ্যতে তিন অঙ্কের সংখ্যায় উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে জাহাজভাঙা শিল্পে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।

তবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর তদারকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন বিশেষ প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত জনবল।

জাহাজভাঙা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও এ রূপান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। আধুনিক ও সুশৃঙ্খল কারখানা ব্যবস্থাপনা শ্রমিকদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলোও আরও গুরুত্ব পাবে।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রস্তাবিত বিশেষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে তা শুধু একটি শিল্পের জন্য নয়, বরং ওই অঞ্চলের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠলে বিভিন্ন কারখানার জন্য নিরাপদ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি কাঠামো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। এখন সেই অবস্থানকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার, শিল্পমালিক, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আইএমও আয়োজিত সেমিনারে উঠে আসা আলোচনা থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সময় পার করছে। একদিকে রয়েছে শিল্পটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা। এই দুই বিষয়কে সমন্বয় করেই ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় সব সহায়তার আশ্বাস এবং সবুজ কারখানার সংখ্যা তিন ডিজিটে নেওয়ার লক্ষ্য দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। প্রস্তাবিত বিশেষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প আরও টেকসই, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব পথে এগিয়ে যেতে পারে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

বাংলাদেশের মানুষ কখনো স্বৈরাচার সমর্থন করেনি: স্পিকার

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিজয়নগরে র‌্যাবের অভিযানে ৩৮০০ ইয়াবাসহ দুই নারী গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

যুদ্ধাপরাধী আযাদের আপিল গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সিদ্ধান্ত ৭ সেপ্টেম্বর

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের রুনা খান

প্রকাশ:৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

শিশু আছিয়া হত্যা মামলায় হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

বাংলাদেশের মানুষ কখনো স্বৈরাচার সমর্থন করেনি: স্পিকার

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিজয়নগরে র‌্যাবের অভিযানে ৩৮০০ ইয়াবাসহ দুই নারী গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের রুনা খান

প্রকাশ:৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

শিশু আছিয়া হত্যা মামলায় হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আদালতে হাসিমুখে পল্লব, পরে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যের ডাক এরদোয়ানের

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ