প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলের বর্তমান সরকার উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শুধু প্রতিবেশী দেশ নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ইস্তাম্বুলে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম উপলক্ষে আয়োজিত মাওলিদ-ই নবী সপ্তাহের এক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন এরদোয়ান। তার বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি এবং মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
এরদোয়ান বলেন, মুসলিম দেশগুলো নিজেদের অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় অন্যদের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে পারে না। আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তিনি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে নিজেদের মতপার্থক্য কমিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বলেন, মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের অধিকার রক্ষা এবং অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। তার ভাষায়, শক্তিশালী ঐক্যের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ আরও কার্যকরভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
এরদোয়ান তার বক্তব্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি দেশটির বর্তমান সরকারকে ‘যুদ্ধকামী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসরায়েল পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, তার ভাষায়, ‘জায়নবাদ’ শুধু প্রতিবেশী দেশগুলোর শান্তির জন্য হুমকি নয়, মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় যারা কাজ করছেন তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করছে। এরদোয়ান ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ব সম্প্রদায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। তিনি ইসরায়েলের নীতিকে আইন ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
তার বক্তব্যে গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননের পরিস্থিতির কথাও উঠে আসে। এরদোয়ান দাবি করেন, এসব অঞ্চলে সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বন্ধে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এরদোয়ানের সাম্প্রতিক বক্তব্য তুরস্কের দীর্ঘদিনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তুরস্ক ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে আসছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং একটি রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবস্থান নিয়েছে আঙ্কারা।
তবে এবার এরদোয়ানের বক্তব্যে শুধু ইসরায়েলের সমালোচনাই নয়, মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও জোট শক্তিশালী করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, তুরস্ক নিজেও মুসলিম বিশ্বে জোট ও সহযোগিতা বাড়াতে এবং নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ কমাতে কাজ করছে।
এরদোয়ান মুসলিম দেশগুলোকে এমনভাবে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান, যেন তারা একটি দেয়ালের ইটের মতো পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে। তার মতে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সক্ষমতাও বাড়বে।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। গাজা ও লেবাননের সংঘাতের পাশাপাশি সিরিয়া, ইরানসহ বৃহত্তর অঞ্চলের বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তুরস্ক নিজেকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে এবং বিভিন্ন সংকটে মধ্যস্থতার ভূমিকা নেওয়ার উদ্যোগও অব্যাহত রেখেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। আগস্টের শুরুতে তিন দেশ একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এরদোয়ানের মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর ঐক্যের আহ্বানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের পার্থক্যও রয়েছে। ফলে এরদোয়ানের আহ্বান বাস্তবে কতটা কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপে রূপ নেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিভিন্ন মুসলিম দেশের ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবস্থান কাছাকাছি হলেও তাদের পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট অবশ্য মতপার্থক্য কমিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক বিরোধ ও বিভাজন আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে দুর্বল করে। তাই অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলোতে ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এরদোয়ানের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি অতীতের বিভিন্ন সংঘাতের উদাহরণ টেনে বলেন, বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতার মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। তার অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতিতেও বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বন্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে তুরস্কের অবস্থান দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের জনগণের বড় একটি অংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। ফলে এরদোয়ানের বক্তব্য শুধু আন্তর্জাতিক কূটনীতির অংশ নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ জনমত ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে, তুরস্কের জন্য এই ইস্যুটি একই সঙ্গে মানবিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। একদিকে আঙ্কারা ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
এরদোয়ানের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুসলিম দেশগুলোর আত্মনির্ভরতা। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য মুসলিম দেশগুলোকে বাইরের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। তার মতে, নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় মুসলিম দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ইসরায়েল এখনো এরদোয়ানের এই বক্তব্যের বিষয়ে আলাদা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দুই দেশের নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইস্যুতে বিপরীত অবস্থান সেই উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এরদোয়ানের নতুন বক্তব্য তাই শুধু একটি রাজনৈতিক ভাষণ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে তুরস্কের দৃষ্টিভঙ্গিরও একটি প্রকাশ। আঞ্চলিক সংকট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও যৌথ অবস্থানের প্রশ্নও তত বেশি সামনে আসছে।
এখন দেখার বিষয়, এরদোয়ানের এই আহ্বান মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর কাছ থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া পায় এবং তা বাস্তব কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ নেয় কি না। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে তুরস্কের এই আহ্বান আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি করে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।


