প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
গুম-খুনের শিকার পরিবার এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের ৭৪ সদস্যকে চাকরির নিয়োগপত্র দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে ১০ জনের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন। এ সময় গুম-খুনের শিকার পরিবার এবং জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে স্বজন হারানো পরিবারের সদস্য, শহীদদের বাবা-মা ও স্ত্রী এবং জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর অংশ হিসেবে তাদের সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সরাসরি নিয়োগপত্র পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন গুমের শিকার ইফতেখার আহমেদ দিনারের ভাই ইশফাক আহমেদ। দীর্ঘদিন ধরে স্বজনের অনিশ্চিত পরিণতি ও পরিবারের নানা সংকটের মধ্যে থাকা এই পরিবারের জন্য চাকরির সুযোগটি নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে এসেছে।
এ ছাড়া গুমের শিকার নুরুজ্জামান জনির ভাই মনিরুজ্জামান হীরা, আনোয়ার হোসেন মাহবুবের ভাই আনান হোসেন নূর, সেলিম রেজা পিন্টুর ভাই হাসনাইন রেজা এবং খালেদ হোসেন সোহেলের স্ত্রী শাম্মী সুলতানাও নিয়োগপত্র পেয়েছেন।
তাদের জীবনের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, স্বজন হারানোর বেদনা এবং অনিশ্চয়তা। পরিবারের একজন সদস্যকে হারানোর পর অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চাপও নেমে আসে। সেই বাস্তবতায় চাকরির সুযোগকে শুধু একটি কর্মসংস্থান নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসনের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ও দৃষ্টিশক্তিহীন যোদ্ধা আলাল আহমেদও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নিয়োগপত্র পেয়েছেন। আন্দোলনের সময় আহত হয়ে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ব্যক্তিদের অনেকেরই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার উদ্যোগ সেই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ আলভীর বাবা মো. আবুল হোসাইন, শহীদ আহনাফের মা জারতাজ পারভীন, আহত যোদ্ধা কাজী সাইমুম সিরাজ এবং ইসরাফিল ইসলামের ভাই মাহবুব আলমের হাতেও নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়।
নিয়োগপত্র পাওয়ার পর কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে তারা গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তাদের বক্তব্যে একদিকে ছিল স্বজন হারানোর গভীর বেদনা, অন্যদিকে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা।
ইশফাক আহমেদ, শাম্মী সুলতানা, আলাল আহমেদ, শহীদ আনভীর বাবা মমতাজ হোসেন, শহীদ আহনাফের মা জারতাজ পারভীন এবং জুলাই যোদ্ধা কাজী সাইমুম সিরাজ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তাদের জন্য চাকরির নিয়োগ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং দীর্ঘদিনের কঠিন সময়ের পর পরিবারের জীবনে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হারানো বা গুরুতর আহত হওয়ার কারণে যেসব পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে, তাদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুম, নিখোঁজ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বিষয়। কোনো পরিবারের সদস্য নিখোঁজ হলে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যান না, তার সঙ্গে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। বছরের পর বছর স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর মানসিক ও আর্থিক চাপ অনেক সময়ই দীর্ঘস্থায়ী হয়।
অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদদের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। পরিবারের কোনো সদস্য নিহত হলে তার ওপর নির্ভরশীল সদস্যদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। গুরুতর আহতদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যয়ও পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের চাকরি দেওয়ার উদ্যোগকে পুনর্বাসনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এসব পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, অতীতের ঘটনার বিচার ও সত্য উদঘাটনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। অনুষ্ঠানে তারা গুম ও হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি জানান। ফলে চাকরির পাশাপাশি ন্যায়বিচারের দাবিও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা হিসেবে উঠে এসেছে।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক ও প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা, শাহাদাৎ স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক ও শাহরিয়ার পামির উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্য মোকছেদুল মোমিন মিথুনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে শনিবারের অনুষ্ঠানে ৭৪ জনের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়ার মাধ্যমে গুম-খুনের শিকার পরিবার এবং জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নিয়োগপত্র হাতে পাওয়া পরিবারের সদস্যদের কাছে দিনটি তাই ছিল আবেগ ও প্রত্যাশায় ভরা। একদিকে হারানো স্বজনের স্মৃতি ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে নতুন কর্মজীবনের সুযোগ—দুই অনুভূতি মিলেমিশে ছিল অনুষ্ঠানের পরিবেশে।
পরিবারের একজন সদস্যের চাকরি অনেক সময় একটি সংকটে থাকা পরিবারের জন্য নতুন আশার দরজা খুলে দিতে পারে। নিয়মিত আয় নিশ্চিত হলে সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিছুটা স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে যেসব পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য এমন উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেশি।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রত্যাশা শুধু পুনর্বাসনে সীমাবদ্ধ নয়। তারা অতীতের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারেরও দাবি জানিয়ে আসছেন। শনিবারের অনুষ্ঠানেও সেই দাবির প্রতিফলন দেখা গেছে।
চাকরির সুযোগ দিয়ে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি গুম-খুন ও জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত সহিংসতার অভিযোগগুলোর বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যাশার বড় একটি অংশ পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর কোনো পরিবারকে স্বজন হারানোর বেদনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না ফেলে, সে জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তেজগাঁওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সেই অনুষ্ঠানে তাই শুধু নিয়োগপত্র বিতরণ হয়নি; স্বজন হারানো ও আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েক ডজন পরিবারের জীবনে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনাও হয়েছে। তাদের হাতে থাকা নিয়োগপত্র একদিকে যেমন জীবিকার নতুন পথ দেখিয়েছে, তেমনি ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণের দাবিও আবার সামনে এনেছে।

