প্রকাশ:৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের প্রান্তিক ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেন সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান। ‘এশিয়ার নোবেল’ হিসেবে পরিচিত মর্যাদাপূর্ণ র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকা, মানবিক সহায়তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় তার দীর্ঘদিনের কাজ এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ স্বীকৃতি পেল।
সোমবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা থেকে র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন ২০২৬ সালের পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। এবারের বিজয়ীদের মধ্যে বাংলাদেশের রুনা খানের পাশাপাশি রয়েছেন সিঙ্গাপুরের বিশিষ্ট ব্যক্তি টমি কোহ এবং মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী বো চি।
বাংলাদেশের জন্য এই অর্জন শুধু একজন ব্যক্তির সম্মান নয়, বরং দেশের সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের দুর্গম চরাঞ্চল, নদীবেষ্টিত এলাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, সেই কাজের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এই পুরস্কার।
পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রুনা খান গভীর আনন্দ ও বিনয়ের সঙ্গে এই সম্মাননা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো নেতা একা পথ চলেন না। তার এই স্বীকৃতি তিনি উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ফ্রেন্ডশিপের সঙ্গে কাজ করা অসংখ্য কর্মী ও সহযোগীর প্রতি।
গত প্রায় ২৫ বছর ধরে যারা ফ্রেন্ডশিপের কাজের ওপর আস্থা রেখেছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি যেমন আনন্দের, তেমনি এটি আরও বড় দায়িত্বও তৈরি করে। কারণ মানুষের জন্য কাজের পথ কখনো একটি পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় না; বরং নতুন স্বীকৃতি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়।
রুনা খানের সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের শুরু বাংলাদেশের দুর্গম ও নদীবেষ্টিত অঞ্চলের মানুষের বাস্তব জীবনের সমস্যাকে কেন্দ্র করে। দেশের অনেক এলাকায় নদীভাঙন, বন্যা, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনযাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এসব অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও মৌলিক সামাজিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ২০০২ সালে রুনা খান প্রতিষ্ঠা করেন ফ্রেন্ডশিপ। একটি ভাসমান হাসপাতালের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি বিস্তৃত সামাজিক উন্নয়ন উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ফ্রেন্ডশিপ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে।
শুরুতে দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই ছিল অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দেশের নদীবেষ্টিত বহু এলাকায় হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় ভাসমান হাসপাতালের ধারণাটি মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। যেসব মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তাদের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর মডেল তৈরি হয়।
পরবর্তীতে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা, জীবিকা, দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখার বিভিন্ন উদ্যোগও যুক্ত হয় ফ্রেন্ডশিপের কার্যক্রমে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। নদীভাঙন, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ। রুনা খানের নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের বাস্তবতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাইরে থেকে কোনো নির্দিষ্ট ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও জীবনধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শনই ফ্রেন্ডশিপের কাজকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের মূল্যায়নে এবারের বিজয়ীদের কাজের মধ্যে মানুষের সেবা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ সৃষ্টি এবং মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তার মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়েছে। রুনা খানের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডও মূলত এই দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ থেকে র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় রুনা খান যুক্ত হলেন নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে। তিনি বাংলাদেশের ১৪তম ব্যক্তি হিসেবে এই সম্মাননা অর্জন করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা এই পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, পরিবেশ, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবকল্যাণে কাজ করা অনেক বাংলাদেশি তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।
সর্বশেষ ২০২৩ সালে জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার লাভ করেন। এর আগে ২০২১ সালে বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী, ২০১২ সালে পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ২০১০ সালে এ এইচ এম নোমান, ২০০৫ সালে মতিউর রহমান এবং ২০০৪ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই সম্মাননা পান।
বাংলাদেশের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ম্যাগসাইসাই বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বিভিন্ন সময়ে সমাজ পরিবর্তন, মানবকল্যাণ এবং উন্নয়নমূলক কাজের জন্য তাদের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে।
র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার এশিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মাননা হিসেবে পরিচিত। ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট র্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই পুরস্কারের প্রবর্তন করা হয়। তিনি ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।
তার মৃত্যুর একই বছর র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৫৮ সাল থেকে এই পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। প্রতিবছর ৩১ আগস্ট র্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের জন্মদিনে ম্যানিলা থেকে পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
২০০৮ সাল পর্যন্ত সরকারি সেবা, জনসেবা, সামাজিক নেতৃত্ব, সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল যোগাযোগ, শান্তি ও আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া এবং উদীয়মান নেতৃত্বসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে এই পুরস্কার দেওয়া হতো। পরে পুরস্কারের কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয় এবং ২০০৯ সাল থেকে উদীয়মান নেতৃত্ব ছাড়া নির্দিষ্ট শ্রেণির সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য ব্যক্তিদের সম্মানিত করা হচ্ছে।
রুনা খানের এই অর্জন বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন খাতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নীরবে কাজ করে যাওয়া অসংখ্য ব্যক্তি ও সংগঠনের কর্মকাণ্ড যে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মূল্যায়িত হতে পারে, তার একটি বড় উদাহরণ এই সম্মাননা।
একটি ভাসমান হাসপাতাল থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগ আজ প্রান্তিক মানুষের জীবনে বহুমাত্রিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শিক্ষা, জীবিকা থেকে জলবায়ু অভিযোজন—মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কাজের স্বীকৃতিই এবার পৌঁছে গেল এশিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের মঞ্চে।
র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে রুনা খান শুধু ব্যক্তিগতভাবে সম্মানিত হলেন না, বরং বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, সম্ভাবনা এবং তাদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করা মানুষের প্রচেষ্টাও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল। তার ভাষায়, কোনো নেতা একা পথ চলেন না। তাই এই পুরস্কারের আনন্দও একক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস, শ্রম ও প্রত্যয়ের সঙ্গে কাজ করে যাওয়া অসংখ্য মানুষের গল্প।


