নেপালে বন্যা-ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ৬০০

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের তাণ্ডবে মৃতের সংখ্যা ছয়শ ছাড়িয়েছে। দেশটির বিভিন্ন পার্বত্য ও দুর্গম এলাকায় কয়েক দিনের টানা দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান চললেও এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষের খোঁজ পাওয়া যায়নি। স্থানীয় পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। আগের হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৭৯ জন। অর্থাৎ শনিবার নতুন করে আরও ৩৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।

তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। কারণ এখনো প্রায় দুই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় এবং বহু স্থান ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে চাপা পড়ায় নিখোঁজদের সন্ধান ও উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।

নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। পাহাড়ি ঢল, প্রবল বৃষ্টিপাত এবং ভূমিধসের কারণে বহু গ্রাম ও জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক পুরোপুরি ধসে গেছে, আবার অনেক এলাকায় সেতু ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্যোগের পর কয়েক দিন ধরে নিখোঁজদের সন্ধানে ব্যাপক অভিযান চালানো হচ্ছে। নেপালের নিরাপত্তা বাহিনী, উদ্ধারকারী দল এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা একযোগে বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছেন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধারকাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এরই মধ্যে শত শত মানুষকে বিভিন্ন দুর্গত এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেক মানুষ পাহাড়ি এলাকায় আটকা পড়েছিলেন। কেউ কেউ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু আকস্মিক ভূমিধস ও পাহাড়ি ঢলের কারণে অনেকেই নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে পারেননি।

রাজধানী কাঠমান্ডুতেও দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। সেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েক ডজন মানুষ চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহতদের মধ্যে কেউ ভূমিধসে আহত হয়েছেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে।

নিখোঁজদের মধ্যে নেপালের নাগরিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। তাদের অনেকেই নেপালের পার্বত্য এলাকায় ট্রেকিং, পর্যটন কিংবা ধর্মীয় তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। পাহাড়ি অঞ্চলের আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তন এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপাল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক হিমালয় অঞ্চলে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণের উদ্দেশ্যে সেখানে যান। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় দুর্যোগ দেখা দিলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকরাও বড় ঝুঁকির মুখে পড়েন।

এবারের দুর্যোগের ভয়াবহতা বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত দৃশ্যে দেখা গেছে, বহু বাড়িঘর কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় রাস্তার ওপর জমে আছে বিশাল পরিমাণ মাটি, পাথর ও গাছপালা।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে নুওয়াকোট জেলার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ বলে জানা গেছে। সেখানে বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সড়ক যোগাযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্তূপ জমে রয়েছে। বন্যার স্রোতে ভেসে আসা নানা বস্তু গাছের সঙ্গে আটকে থাকতে দেখা গেছে।

দুর্যোগে বেঁচে যাওয়া মানুষের অনেকেই তাদের প্রিয়জনের সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটছেন। কেউ হারিয়েছেন পরিবারের সদস্যকে, কেউ হারিয়েছেন ঘরবাড়ি ও জীবনের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়। কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হতভম্ব মুখ দুর্যোগের মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শুধু মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ভয়াবহ বন্যা বা ভূমিধস বহু মানুষের জীবনকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বদলে দেয়। ঘরবাড়ি হারানোর পাশাপাশি মানুষের জীবিকা, কৃষিজমি, ব্যবসা এবং যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়।

নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে এই সংকট আরও জটিল। কারণ দুর্গম এলাকায় পুনরায় যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সময়সাপেক্ষ। অনেক এলাকায় সড়ক ধসে যাওয়ায় স্থলপথে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় উদ্ধারকাজের পাশাপাশি দুর্গত মানুষের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে নেপাল সরকারের মন্ত্রীরাও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এক মাসের বেতন প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশটির মন্ত্রীরা।

শুক্রবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ সূত্রে জানানো হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতীকী ও মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা বিবেচনায় সামনে বড় ধরনের পুনর্বাসন কার্যক্রম প্রয়োজন হতে পারে। যেসব পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করতে হবে।

এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিখোঁজ প্রায় দুই হাজার মানুষকে ঘিরে। উদ্ধারকারী দল যত দ্রুত দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে পারবে, ততই নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়বে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্ভাবনা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

নেপালের কর্তৃপক্ষ এখনো ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক অঞ্চলের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনও পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি। ফলে নতুন তথ্য আসার সঙ্গে সঙ্গে মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।

হিমালয়কন্যা নেপাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে দেশটি নিয়মিত বন্যা, ভূমিধস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে প্রবল বর্ষণের সময় পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধস বহু মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

এবারের এই ভয়াবহ দুর্যোগ আবারও প্রমাণ করল, পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় দ্রুত সতর্কতা, কার্যকর উদ্ধারব্যবস্থা এবং দুর্গম এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে নেপালের মানুষের চোখ উদ্ধার অভিযানের দিকে। নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশায় অসংখ্য পরিবার অপেক্ষা করছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি এলাকায় এখনো যারা আটকে থাকতে পারেন, তাদের দ্রুত খুঁজে বের করাই উদ্ধারকারী বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য।

মৃতের সংখ্যা ছয়শ ছাড়িয়ে যাওয়ার এই ভয়াবহ ঘটনায় নেপাল এখন গভীর মানবিক সংকটের মুখোমুখি। উদ্ধার অভিযান, চিকিৎসা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বিবেচনায় আগামী দিনগুলোতে এই দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

গুম-খুন ও জুলাই শহীদ পরিবারের ৭৪ জনকে চাকরি দিলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যের ডাক এরদোয়ানের

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

অবৈধ অস্ত্রের তথ্য দিলে মিলবে ২ লাখ টাকা পুরস্কার

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দারিদ্র্য বাড়ছে, চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে ৬ লাখ মানুষ

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাইকে দুই তরুণের মাঝে নিথর তরুণী, কী ঘটেছিল সেদিন?

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যের ডাক এরদোয়ানের

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

অবৈধ অস্ত্রের তথ্য দিলে মিলবে ২ লাখ টাকা পুরস্কার

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দারিদ্র্য বাড়ছে, চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে ৬ লাখ মানুষ

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাইকে দুই তরুণের মাঝে নিথর তরুণী, কী ঘটেছিল সেদিন?

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হলেন আইরিন খান

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফোবানা সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন আরিফুল হক

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চুনারুঘাটে গ্রামীণ ব্যাংক কর্মকর্তার বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ