প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য একটি স্বপ্নের ম্যাচ আয়োজনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল ঢাকায় এসে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলতে পারে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশের ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। তারকা ফুটবলারদের সরাসরি মাঠে দেখার সম্ভাবনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন সমর্থকেরা। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পথেই এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থের বিষয়টি।
আগামী অক্টোবরে বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন। সম্ভাব্য সূচি অনুযায়ী, ৩ অক্টোবর কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার পর ৬ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশের মুখোমুখি হতে পারে ব্রাজিল। যদিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব হাতে পায়নি, তবু ব্রাজিলের প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
গত রোববার ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে। তারা জাতীয় স্টেডিয়াম ও বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার মাঠ এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন করে। পাশাপাশি দলের আবাসন ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে ঢাকার কয়েকটি পাঁচ তারকা হোটেলও ঘুরে দেখে প্রতিনিধি দলটি। সফর শেষে তাদের নিজস্ব ফেডারেশনে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী আনুষ্ঠানিক আলোচনা এগোতে পারে।
তবে এর মধ্যেই সরকারের অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। মঙ্গলবার বক্সিং ফেডারেশনের একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ব্রাজিলের মতো একটি বড় দলের সফর আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থ সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করার মানসিকতা এই মুহূর্তে সরকারের নেই।
আমিনুল হক বলেন, দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের বড় ধরনের ব্যয় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের জন্য বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় করা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে সরকার আর্থিকভাবে সহযোগিতা না করলেও প্রশাসনিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ব্রাজিলকে ঢাকায় আনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল হয়নি। বরং অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বাফুফে যদি বেসরকারি স্পন্সর ও অন্যান্য অংশীদারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমিনুল হক আরও জানিয়েছেন, ব্রাজিলের বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর আলোচনা হয়েছে। তবে ম্যাচের সম্ভাব্য ব্যয়, আয়োজক কাঠামো এবং আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে এখনো বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
বাংলাদেশের জন্য ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটি নিঃসন্দেহে বড় একটি আকর্ষণ হতে পারে। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল দলকে দেশের মাটিতে খেলতে দেখার সুযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে একটি স্বপ্ন। বিশেষ করে ব্রাজিলের বর্তমান প্রজন্মের তারকা খেলোয়াড়দের ঢাকায় দেখার সম্ভাবনা সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
তবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, এমন একটি ম্যাচ আয়োজন দর্শকদের জন্য আনন্দের হলেও শুধু ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি ম্যাচ খেললেই বাংলাদেশের ফুটবলের কাঠামোগত উন্নয়ন হয়ে যাবে—এমনটা ভাবার কারণ নেই। তাঁর মতে, এটি বাংলাদেশের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও স্মরণীয় একটি আয়োজন হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশের ফুটবলের উন্নতির জন্য আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ব্রাজিলের প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরের পর বাফুফের পক্ষ থেকেও আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল। বাফুফের নির্বাহী সদস্য সাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া শাহীন জানিয়েছিলেন, ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ আয়োজনের বিষয়ে তারা ইতিবাচকভাবে এগোতে চান। এ জন্য বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল ফিফার সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সূচির সঙ্গে বিষয়টি সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন।
কারণ সম্ভাব্য ম্যাচটির সময়সূচি বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে প্রায় একই সময়ে পড়ছে। ২৪ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ার কথা ফিফা আসিয়ান কাপের। সেখানে বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচ খেলবে। এরপর অবস্থান নির্ধারণী ম্যাচসহ বাংলাদেশের মোট চারটি ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা রয়েছে। টুর্নামেন্টের ফাইনাল ৩ অক্টোবর।
অন্যদিকে ব্রাজিলেরও সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুতে আন্তর্জাতিক সূচি রয়েছে। ২৫ ও ২৯ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুটি ম্যাচ খেলার পর ৩ অক্টোবর কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা রয়েছে তাদের। কলকাতার ম্যাচের মাত্র তিন দিন পর ঢাকায় বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার সম্ভাবনাই এখন আলোচনায় এসেছে।
ফলে ম্যাচটি বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু অর্থের সংস্থান করলেই হবে না, আন্তর্জাতিক সূচির বিষয়টিও সমন্বয় করতে হবে। বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনকে ফিফা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে ব্রাজিলের প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী মাঠ, ড্রেসিংরুম, টেকনিক্যাল রুম, নিরাপত্তা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতিও নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা সফরের সময় ব্রাজিলের প্রতিনিধি দল জাতীয় স্টেডিয়ামের মাঠ ও আশপাশের অবকাঠামো নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে বাফুফের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে ড্রেসিংরুম, টেকনিক্যাল রুম এবং খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও উন্নতির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাফুফের মতে, এসব উন্নয়ন স্বল্প সময়ের মধ্যেই করা সম্ভব।
ব্রাজিলের সম্ভাব্য সফরের বহরও ছোট হবে না। প্রায় ৯০ সদস্যের একটি দল নিয়ে তারা ঢাকায় আসতে পারে বলে আলোচনা হয়েছে। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচিং স্টাফ, চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যান্য সহায়ক সদস্যদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে আবাসন, যাতায়াত, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং ম্যাচ আয়োজন—সব মিলিয়ে ব্যয়ের পরিমাণও বড় হতে পারে।
এ কারণেই বাফুফের একার পক্ষে ম্যাচটি আয়োজন করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে থেকেই বাফুফের পক্ষ থেকে সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান অনুযায়ী, সরাসরি বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে বেসরকারি খাত ও স্পন্সরদের মাধ্যমে অর্থের সংস্থান করাই হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ।
এখন মূলত কয়েকটি বিষয় নির্ধারণের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের মাটিতে ব্রাজিলের সম্ভাব্য ম্যাচটি বাস্তবে রূপ নেবে কি না। ব্রাজিলের প্রতিনিধি দলের প্রতিবেদন, দুই দেশের ফুটবল ফেডারেশনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা, ফিফার অনুমোদন, আন্তর্জাতিক সূচির সমন্বয় এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—ম্যাচ আয়োজনের প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান। এসব বিষয়ে অগ্রগতি হলেই পরিষ্কার হবে, অক্টোবরের শুরুতে ঢাকার মাঠে সত্যিই ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের দেখা যাবে কি না।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তাই অপেক্ষাটা এখন শুধু একটি ম্যাচের জন্য নয়; এটি দেশের মাটিতে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলের আগমনের সম্ভাবনাকে ঘিরে। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে বড় দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ সীমিত বাংলাদেশের জন্য এমন একটি ম্যাচ নিঃসন্দেহে বড় অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে আবেগের পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা, বাস্তব পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—এমনটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


