প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাপ্রার্থীদের নির্ধারিত সাক্ষাৎকারের সময়সূচিতে সাময়িক পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে একটি বৈশ্বিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সেই কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভিসা-সংক্রান্ত অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আগ্রহী ভিসাপ্রার্থীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব আবেদনকারীর সাক্ষাৎকারের সময় আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল, তাঁদের অনেককে ই-মেইলের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন সাক্ষাৎকারের তারিখ কবে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পরবর্তী সময়ে জানানো হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র মঙ্গলবার জানান, বিশ্বের বিভিন্ন মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ভিসা পরিষেবার অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হবে। তবে এই প্রশিক্ষণ কত দিন চলবে কিংবা কোন কোন দেশে কত সংখ্যক আবেদনকারীর সাক্ষাৎকারের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
নতুন এই উদ্যোগকে শুধু প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ হিসেবে দেখলেও এর পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিবর্তিত অভিবাসন নীতির প্রভাব রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর পাশাপাশি বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ রক্ষার জন্য ভিসাপ্রার্থীদের বিষয়ে আরও বিস্তৃত ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। নতুন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির একটি লক্ষ্য হলো কনস্যুলার কর্মকর্তাদের এমন আবেদনকারী শনাক্ত করার বিষয়ে দক্ষ করে তোলা, যাঁরা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি জনকল্যাণমূলক সুবিধার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভিসা আবেদন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের মধ্যে অভিন্ন পদ্ধতি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিষয়ক কঠোর নীতির আওতায় এরই মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ভিসা ও অভিবাসন সুবিধা নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ, অভিবাসন নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে আবেদনকারীদের কর্মকাণ্ডও প্রশাসনের নজরে আসছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে অংশগ্রহণ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের গাজা নীতির সমালোচনার মতো কর্মকাণ্ডকে ঘিরেও ভিসা ও অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এসব পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। প্রশাসনের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আগে আবেদনকারীর পরিচয়, উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দেশটির আইন ও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনাও রয়েছে। এসব সংগঠনের অভিযোগ, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নামে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে এ ধরনের পদক্ষেপ উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে বলে তারা মনে করছে।
এর মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সম্প্রতি একজন মার্কিন বিচারক বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের অভিবাসী ভিসা স্থগিত করার একটি প্রশাসনিক নীতি বাতিল করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁর আইনি ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।
এই আইনি পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে প্রশাসন অভিবাসন ব্যবস্থায় কঠোরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে এসব সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। ফলে ভিসাপ্রার্থীদের জন্য নীতির পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব বোঝা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে মার্কিন ভিসাপ্রার্থীদের বর্তমান অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরিবর্তনের খবরটি প্রথম প্রকাশ করে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত থাকা অভিবাসী ভিসাপ্রার্থীদের ই-মেইলের মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে তাঁদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। নতুন তারিখ পরে জানিয়ে দেওয়া হবে।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থগিত বা পুনর্নির্ধারণের ফলে যেসব আবেদনকারী দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাঁদের জন্য নতুন করে অপেক্ষার সময় তৈরি হতে পারে। শিক্ষার্থী, কর্মী, পরিবারভিত্তিক অভিবাসনপ্রার্থী কিংবা অন্যান্য শ্রেণির ভিসাপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারের তারিখ পরিবর্তনের প্রভাব আলাদা হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের ভ্রমণ, শিক্ষা, চাকরি বা পারিবারিক পুনর্মিলনের সঙ্গে নির্ধারিত সময়সীমা যুক্ত রয়েছে, তাঁদের জন্য অনিশ্চয়তাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি যে বিশ্বের সব ধরনের ভিসা আবেদন গ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বরং প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূলত নির্ধারিত সাক্ষাৎকারের সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের বিষয়টিই সামনে এসেছে। তাই ভিসাপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরিবর্তন এবং ভিসা আবেদন সম্পূর্ণ স্থগিত—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, কনস্যুলার কর্মকর্তাদের নতুন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভিসা আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও অভিন্ন নীতি প্রয়োগের প্রস্তুতি নেওয়া হতে পারে। তবে প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর ভিসা প্রক্রিয়ায় ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় ফিরে তাঁর প্রশাসন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে বৈধ অভিবাসন ও ভিসা প্রক্রিয়াতেও কঠোর যাচাইয়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ভিসাপ্রার্থীদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনর্নির্ধারণের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর নীতিগত পরিবর্তনেরই অংশ কি না, তা স্পষ্ট হতে আরও সময় লাগবে। আপাতত আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্ধারিত সাক্ষাৎকারের সময় পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেট থেকে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করা এবং নতুন তারিখ সম্পর্কে দেওয়া বার্তা অনুসরণ করা।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রত্যাশায় থাকা হাজারো মানুষের জন্য ভিসা সাক্ষাৎকারের একটি নির্ধারিত তারিখ দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল। সেই তারিখ হঠাৎ পরিবর্তিত হলে পরিকল্পনা, ভ্রমণ এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই নতুন সময়সূচি দ্রুত জানানো এবং প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখার বিষয়টি এখন ভিসাপ্রার্থীদের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা হয়ে উঠেছে।


