প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে বড় পরিসরে এগোতে চায় সরকার। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। শনিবার (২২ আগস্ট) সিলেট সফরকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি সরকারের এ পরিকল্পনার কথা জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সরকার বিকল্প জ্বালানির উৎস বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুৎকে বড় আকারে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়ির বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করতে চায়। দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা সরাসরি সম্পর্কিত। শিল্পকারখানার উৎপাদন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, কৃষি, যোগাযোগ ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সব ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট দেখা দিলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা ও বিনিয়োগের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে এনার্জি ইনটেনসিভ বিনিয়োগের পরিবর্তে সরকার ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসারে কাজ করবে। অর্থাৎ বড় আকারে বিপুল জ্বালানি নির্ভর শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যবহার করে পরিচালিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তিনি জানান, দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প খাতের অবদান ভবিষ্যতে অন্তত ৬০ শতাংশে রূপান্তর করতে চায় সরকার। অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি এবং উৎপাদন কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শহরের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এই খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র কারখানা, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পোশাক, কৃষিভিত্তিক উৎপাদনসহ বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গড়ে ওঠার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা থাকলে এসব উদ্যোগের উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।
সিলেট সফরে বাণিজ্যমন্ত্রী প্রস্তাবিত নতুন বিসিক শিল্পনগরী নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, সিলেটের প্রস্তাবিত নতুন বিসিক শিল্পনগরীর জন্য সরকার বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবছে। ফলে নতুন শিল্পনগরীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ বা অন্যান্য বিকল্প উৎস ব্যবহারের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
সিলেটের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নতুন বিসিক শিল্পনগরীকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ অঞ্চলে শিল্পকারখানা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পরিকল্পিত শিল্প অবকাঠামো তৈরি হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে সিলেটের তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদনমুখী উদ্যোগগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে শিল্পনগরীর কার্যক্রম সম্প্রসারণের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদাও বাড়বে। এ কারণে শুরু থেকেই বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পনগরীর বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
সরকারের ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো তৈরি, বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রয়োজনীয় জমি, প্রাথমিক বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেশি থাকলেও রাতের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সঞ্চয় প্রযুক্তি বা অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
দেশের শিল্প খাতের বিকাশের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে স্থানীয় শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তাই বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার মাধ্যমে তুলনামূলক স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে একই সঙ্গে শিল্পায়ন ও জ্বালানি নীতির মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত—দুটি উদ্যোগই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও টেকসই করার লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত।
সিলেটের ক্ষেত্রে এই পরিকল্পনার গুরুত্ব আরও বেশি হতে পারে। প্রবাসী আয় ও পর্যটনের পাশাপাশি শিল্প ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সিলেটের অর্থনীতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ রয়েছে। নতুন বিসিক শিল্পনগরী এবং সেখানে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসারে সরকারের উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোয় এবং এর সুফল শিল্পকারখানা, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের শিল্পায়নেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে


